প্রতিমা শুকোনো চলছে পুরুলিয়া শহরে। ছবি: সুজিত মাহাতো।
করোনার কামড় তো রয়েছেই। এ বার দোসর খারাপ আবহাওয়া। জোড়া ধাক্কা সামলাতে হিমশিম অবস্থা পুরুলিয়া জেলার নানা প্রান্তের মৃৎশিল্পীদের। কম লাভে কাজ সারতে হলেও সময়ে তা শেষ করা নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে কুমোরপাড়ায়। তাই প্রতিমা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত শিল্পীদের উদ্বেগ কিছুতেই কমছে না।
এ বারে ১১টি প্রতিমার বরাত পেয়েছেন পুরুলিয়া শহরের প্রতিমাশিল্পী ফকির পাল। শহরের নামোপাড়ায় তাঁর ঠাকুর গড়ার আস্তানায় গিয়ে দেখা গেল, আকাশে মেঘ দেখেই প্রতিমায় প্লাস্টিকের আড়াল দিচ্ছেন। জানালেন, প্রতিমা গড়ার পরিকাঠামো নেই। রাস্তার ধারের ফাঁকা জায়গায় কোনও মতে কাজ হয়। বৃষ্টিতে তাই ঝামেলা পোহাতে হয়।
তবে বরাত গত বারের তুলনায় বাড়লেও লাভের আশা নেই বলে আক্ষেপ তাঁর। কেন? তাঁর ব্যাখ্যা, “গত বারে যে প্রতিমা গড়ে ৪৫ হাজার টাকা পেয়েছি, এ বারে সে ঠাকুরই গড়তে হচ্ছে ২৫ হাজারে। উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, করোনায় বাজেট কম। প্রতি বার প্রতিমা গড়ি বলে এ বারেও দিতে হচ্ছে। অথচ, মাটি, খড়, সাজ—সবেরই দাম বেড়েছে।”
একই কথা শোনালেন কাশীপুরের মৃৎশিল্পী নরেশনাথ পাল।
প্রায় একশো বছর আগে, পঞ্চকোট রাজাদের সৌজন্যে কৃষ্ণনগর থেকে কাশীপুরে আসেন তাঁর পূর্বপুরুষেরা। নরেশনাথের কথায়, “করোনা খানিক কমলেও কাজের বরাত বাড়েনি। ঝাড়খণ্ড থেকে কোনও বায়না এ বারে আসেনি। পাশাপাশি, বাজেট কম বলে উদ্যোক্তারা ছোট আকারের ঠাকুর গড়ার জন্য বলছেন। অথচ, কাঁচামালের দাম যেমন বেড়েছে, কলকাতা থেকে ডাকের সাজ আনতে যাতায়াতের খরচও আগের মতো নেই।”
তা-ও কোনও মতে সামাল দেওয়ার চেষ্টা চললেও, আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও কঠিন করেছে, জানালেন তিনি।
জোলো আবহাওয়ায় কাঠামোয় মাটি ধরছে না। এ অবস্থায় আগুনে শুকিয়ে কাজ করতে হচ্ছে বলে জানালেন পুরুলিয়া শহরের শিল্পী রাহুল দাসও।
এ দিকে, ফি বছরে বেশ কিছু প্রতিমার বরাত থাকলেও এ বার ঝাড়খণ্ডের টাটানগরে একটাই ঠাকুর গড়ছেন বলে জানান বাঘমুণ্ডির চড়িদা গ্রামের শিল্পী মিন্টু সূত্রধর।
তাঁর আক্ষেপ, “যে ঠাকুর ৮০ হাজারে গড়ি, এ বারে তা-ই গড়তে হচ্ছে ৬০ হাজার টাকায়।” ওই গ্রামের ফাল্গুনী সূত্রধর ঠাকুর গড়ছেন ওড়িশার সুন্দরগড়ে। তিনি জানালেন, করোনা প্রভাব ফেলেছে পারিশ্রমিকে।
বায়না কমেছে বলে দাবি হুড়ার তপন কালিন্দীরও। মানবাজার, পুরুলিয়া-সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে গোটা পাঁচেক ঠাকুর গড়ছেন।
তবে তাঁর আশঙ্কা, “খারাপ আবহাওয়ায় কাজে দেরি হয়েছে। আবহাওয়া ফের বিগড়োলে পুজোর আগে ঠাকুর গড়ার কাজ শেষ হওয়া মুশকিল।”
রঘুনাথপুরের শিল্পী তুলসী সূত্রধর যদিও আশাবাদী। বললেন, “বরাত কমেছে। জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। তবুও পুজোর সঙ্গে রুজি-রোজগার জুড়ে। তাই সমস্যা হলেও কাজ করে যেতে হবে।”