বিষ্ণুপুরের দ্বারিকা শিল্পাঞ্চলের সেই বন্ধ হয়ে থাকা ফেরো অ্যালয় কারখানা (ইনসেটে মৃত শ্রমিক)।
শেষ ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে মালিকপক্ষ বলেছিল, ১৫ মে-র মধ্যে তারা শ্রমিকদের সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে দেবে। তার আগের রাতেই আত্মঘাতী হলেন ওই বন্ধ কারখানার এক শ্রমিক। বকেয়া মেটানোর কথাও কিন্তু রাখেনি মালিকপক্ষ।
ঘটনাটি বিষ্ণুপুরের দ্বারিকা শিল্প তালুকের একটি ফেরো অ্যালয় কারখানার। রাতের ডিউটিতে আসা কর্মীদের তাড়িয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল ওই কারখানায়। সেটা গত বছর ডিসেম্বরের কথা। তার পর থেকে আর ঝাঁপ খোলেনি কারখানায়। কর্মী ও শ্রমিকেরা আচমকা রুজিহীন হয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। ছ’মাস পরে এক শ্রমিকের আত্মহত্যা ফের সামনে এনে ফেলল বন্ধ কারখানার কর্মী-শ্রমিকদের চরম দুর্দশার কাহিনিকে।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃত শ্রমিকের নাম নীলু আইচ (২৭)। সোমবার সকালে বিষ্ণুপুর থানার দেউলি গ্রামে নিজের টিনের ছাউনির বাড়ির কড়িকাঠে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মেলে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, নীলু আত্মঘাতীই হয়েছেন। পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করেছে। ঘটনাটি জানাজানি হতেই কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উদাসীনতার অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বাকি কর্মী-শ্রমিকেরা। শ্রমিক সংগঠনগুলিও একযোগে কারখানার মালিকপক্ষের বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙুল তুলেছে। শ্রমিক সংগঠন সিটু-র বাঁকুড়া জেলা কমিটির সদস্য তথা বিষ্ণুপুরের প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক স্বপন ঘোষ বলেন, “এই ঘটনা খুবই দুঃখজনক। নীলু ওই কারখানায় আমাদের সংগঠনের সদস্য ছিলেন। প্রায় ১৫ বছর ড্রাই অপারেটরের (গুল তৈরির) কাজ করতেন। প্রাপ্য বকেয়া টাকা না পেয়ে, কাজ হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। আমাদের সঙ্গে শেষ আলোচনায় ঠিক হয়েছিল, পাওনা টাকা মালিকপক্ষ দিয়ে দেবে। দেখা যাচ্ছে, সেটা প্রতিশ্রুতি হয়েই রয়ে গিয়েছে। দ্রুত বকেয়া মেটানোর দাবি নিয়ে আবার আন্দোলনে নামব আমরা।’’
কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মৃতের স্ত্রী অর্চনা আইচ।
২০০০ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের এক শিল্পগোষ্ঠী দ্বারিকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ সেন্টারে ‘শ্রী বাসবী ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামে ওই ফেরো অ্যালয় কারখানাটি তৈরি করেছিল। গত ১৫ ডিসেম্বর রাতের ডিউটিতে আসা কর্মীদের নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে বের করে গেটে তালা মেরে ‘লক-আউট’ নোটিস ঝুলিয়ে দেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। এক ধাক্কায় কাজ হারান অন্তত ৮০০ শ্রমিক। কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে যৌথ ভাবে পথে নামে তৃণমূল, সিপিএম এবং বিজেপি প্রভাবিত শ্রমিক সংগঠন। শ্রমিক-কর্মীদের নিয়মনীতি মেনে কাজ করতে না চাওয়ার মানসিকতা ও কাঁচামালের জোগানে টানই কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে দাবি করেছিলেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকেরা অবশ্য নিয়ম না মানার কথা অস্বীকার করে মালিকপক্ষের কারখানা চালানোর সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। চাপে পড়ে বিষ্ণুপুর মহকুমা শাসকের অফিস, দুর্গাপুর ও কলকাতায় শ্রম দফতর, পরে বাঁকুড়ার জেলা শাসকের দফতরেও একাধিকবার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, মালিক পক্ষ ও প্রশাসনের আধিকারিকরা। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। স্তিমিত হয়ে আসে তিন শ্রমিক সংগঠনের যৌথ কর্মসূচি। এ দিকে, দীর্ঘ ছ’মাসের বেকারি সহ্য করতে না পেরে বহু শ্রমিকই অন্য রুজির পথ বেছেছেন। কেউ সব্জি বিক্রি করছেন, কেউ বা ভ্যান রিকশা চালাচ্ছেন।
এ দিন সকালে দেউলি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল শোকের ছায়া নেমেছে মৃতের পরিবারে। বছর সাতেক আগে নীলুর বিয়ে হয় জয়পুরের গোপালনগর গ্রামের বাসিন্দা অর্চনার সঙ্গে। তাঁদের পাঁচ ও দু’বছরের দুই মেয়ে আছে। অর্চনা এ দিন কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। নীলুর মামা গৌতম বীর বলেন, “ওর বাবা মারা যাবার পর নীলুকে আমার কাছে এনে রেখেছিলাম। একই কারখানায় দু’জনে ১৫ বছর ধরে কাজ করেছি। পরে আমার বাড়ির পাশে নিজে বাড়ি করে। বছর সাতেক আগে বিয়েও দিয়েছিলাম। দুটো বাচ্চা মেয়ে। কারখানা বন্ধ হয়ে ওকেও খেয়ে নিল!’’ তাঁর ক্ষোভ, “আমাদের প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এবং কয়েক মাসের বেতন মিলিয়ে অনেক টাকা পাওনা রয়েছে। সে-সব না মিটিয়ে কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়েছে অজুহাত তুলে রাতে আমাদের তাড়িয়ে তালা ঝোলাল! আমরা কী খাব, কী করে সংসার চলবে কিছুই শুনল না মালিকপক্ষ। রাজমিস্ত্রির কাজে গিয়েও কাজ পাইনি। ধার করে ক’দিন সংসার চলে? অভিমানে চলেই গেল ছেলেটা!” তিনি জানান, দিন কয়েক আগে বাড়ির সকলকে নিয়ে দুর্গাপুরের কাছে একটি বিয়ে বাড়িতে গিয়েছিলেন নীলু। বৃহস্পতিবার একা ফিরে আসেন। অনেক রাতে বাইরে কোথাও খাওয়া-দাওয়া করে শুয়েছিলেন। সকালে মামি চা দিতে গিয়ে দেখেন দরজা বন্ধ। ডাকাডাকিতে সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে তাঁরা দেখেন নীলুর ঝুলন্ত দেহ।
এ দিন দুপুরে নীলুর দেহ যখন বিষ্ণুপুর হাসপাতালে পৌঁছয়, থেকে ছুটে আসেন খুড়শ্বশুর সুভাষ মল্ল। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “কারখানা বন্ধের পর নীল আমাদের বলত, দেখবেন অনেক পাওনা টাকা হাতে এসে যাবে। একটা দোকান খুলব। কোনও চিন্তা থাকবে না। কিন্তু, ভিতরে খুব গুমরে গুমরে থাকত। আমার ভাইঝিকেও (নীলুর স্ত্রী) বুঝতে দিত না। কী ভাবে যে কী হয়ে গেল!” দেউলি গ্রামে নীলুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন অসীম রায়। তাঁরা ছিলেন সহকর্মীও। অসীম বললেন, “শেষের দিকে রাজমিস্ত্রির কাজও জুটছিল না। হতাশা যে ওকে এতটাই গ্রাস করবে, তা আমরা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি!’’
শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় জনতা মজদুর মোর্চার বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অঞ্জন নাগ চৌধুরী কারখানা খোলার ব্যাপারে মালিকপক্ষের পাশাপাশি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, “অতগুলি মানুষের পেটের ভাত বন্ধ। তবু কারখানা খোলার ব্যাপারে কোনও উচ্চবাচ্চ্য না হওয়ায় এমন ঘটনা ঘটে গেল। রাজ্য সরকারের উদাসীনতাও এর জন্য দায়ী!’’ এই অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেননি বিষ্ণুপুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের বস্ত্রমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “ওই কারখানা খোলা নিয়ে নানা ভাবে চেষ্টা চলছে। তারই মাঝে এমন মর্মান্তিক খবরটি এ দিন সকালে আমার কাছে এসেছে। আমি এখন কলকাতায়। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব।’’ বিষ্ুপুরের সহকারী শ্রম কমিশনার সুভাষ মুখোপাধ্যায় জানান, গত ১৭ মার্চ জেলাশাসকের অফিসে কারখানা খোলা নিয়ে হওয়া শেষ বৈঠকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি প্রতিশ্রুতি দেন, ১৫ মে-র মধ্যে শ্রমিকদের সমস্ত বকেয়া তাঁরা মিটিয়ে দেবেন। সুভাষবাবু বলেন, ‘‘মালিকপক্ষ কথা রাখেনি। আবার তাঁদের ডেকে বৈঠকে বসার চেষ্টা হবে।’’
রুজিহীন শ্রমিকদের অবশ্য প্রশ্ন, পরের পর বৈঠক করে কী লাভ হচ্ছে? তাঁদের অবস্থা তো দিনদিন খারাপ থেকে আরও খারাপ হচ্ছে। এই প্রশ্নের সদুত্তর নেই প্রশাসনের কাছে।
ছবি: শুভ্র মিত্র।