জল কম, পর্যটকদের মন ভরবে তো

ছোটবড় পাহাড়ের ঘা ছুঁয়ে বিরাট জলরাশি। আর সেই জলেই নৌকাবিহার।— এই আকর্ষণেই পর্যটকরা পুজোর পর থেকেই ভি়ড় করেন মুকুটমণিপুরে। কিন্তু এ বার বৃষ্টি কম হওয়ায় এই চেনা ছবিটাই বদলে গিয়েছে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:৪৪
Share:

বৃষ্টিপাত কম হওযায় মুকুটমণিপুর জলাধার শুষ্কপ্রায়। তাই এ বার পর্যটকদের আনাগোনা কেমন হবে সংশয়ে পর্যটন ব্যবসায়ীরা। ছবি: দেবব্রত দাস

ছোটবড় পাহাড়ের ঘা ছুঁয়ে বিরাট জলরাশি। আর সেই জলেই নৌকাবিহার।— এই আকর্ষণেই পর্যটকরা পুজোর পর থেকেই ভি়ড় করেন মুকুটমণিপুরে। কিন্তু এ বার বৃষ্টি কম হওয়ায় এই চেনা ছবিটাই বদলে গিয়েছে।

Advertisement

ইতিমধ্যেই পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেলেও জলাধারে জল কম থাকায় পর্যটন ব্যবসা মার খাওয়ার আশঙ্কা দেখা করছেন স্থানীয়েরা। দুর্ভাবনায় পড়েছেন নৌকা চালক থেকে মাছ ব্যবসায়ী— সকলেই। এ দিকে আবার বোরো ও রবি চাষের মরসুমে জল ছাড়া যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে কংসাবতী সেচ দফতর।

ফলে মাথায় হাত পড়েছে ওই জলাধারের ক্যানালের সেচ নির্ভর দক্ষিণ বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকার চাষিরাও।

Advertisement

কুমারী ও কংসাবতী নদীর জলাধার মুকুটমণিপুর রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। বছরভর সারা দেশের পর্যটকদের ভিড় এখানে লেগেই থাকে। সাধারণত পুজোর পর সেই ভিড় অনেকটাই বেড়ে যায়।

মোটরচালিত এবং হাতে টানা মিলিয়ে জলাধারে রয়েছে প্রায় ৫০টি নৌকা। আশপাশের তেঁতুলচিটা, খড়িডুংরি, ভুটকুঘুটু, ভেলাইগোড়া, ভমরপুর, পুড্ডি, বনপুকুরিয়া-সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের রুজিরুটি নির্ভর করে এই নৌকাগুলির উপর।

সম্প্রতি মুকুটমণিপুরে গিয়ে দেখা গেল, হাতেগোনা দু-চারটি নৌকা রয়েছে। পর্যটকদের ভিড়ও কম। আসানসোলের নিয়ামতপুর থেকে বেড়াতে এসেছিলেন রবি সিংহ এবং রাজীব সিংহ। জল কম দেখে তাঁরা বেশ হতাশ। দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নৌকা চালক সুরেশ সিং সর্দার, জীবন মুদি এবং সুকেশ সিং পাতররা। জলাধার লাগোয়া দোকানদাররাও জানালেন, এ বছর বিক্রিবাটা তেমন জমেনি।

পর্যটনের পাশাপাশি মুকুটমণিপুর জলাধারে মাছ চাষ হয়। খাতড়া ব্লকের গোড়াবাড়ি, রানিবাঁধ ব্লকের পুড্ডি, অম্বিকানগর এবং হিড়বাঁধ ব্লকের মশিয়াড়া পঞ্চায়েতের প্রায় ৩০টি গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে সাতটি সমবায় গঠিত হয়েছে। সেই সমবায়গুলির প্রায় হাজার চারেক মানুষ এই মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। জল কম থাকায় সঙ্কটে পড়েছেন তাঁরাও।

মশিয়াড়া ধীবর মৎস্য সমিতির কর্মকর্তা বিমল ধীবর বলেন, “প্রতিদিন জলস্তর নামছে। মাছ সে ভাবে ওঠেইনি এ বছর।”

জলাধারে মাছ ধরেন পুড্ডি গ্রামের লকাই সর্দার এবং ঝাপানডিহি গ্রামের শুকদেব দুলেরা। তাঁদের আক্ষেপ, সারা দিন ধরে চেষ্টা করেও বিশেষ মাছ উঠছে না। সংসার চালাতে তাঁরা হিমসিম খাচ্ছেন।

কংসাবতী সেচ দফতর সূত্রের খবর, মুকুটমণিপুর জলাধার থেকে খরিফ এবং বোরো মরসুমে জল ছাড়া হয়। বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও হুগলি জেলার ৫ লক্ষ ৭০ হাজার একর জমিতে এখান থেকে সেচের জল পৌঁছয়। বর্তমানে এই জলাধারে জল ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৪৪২ ফুট (পরিমাণে ৩ লক্ষ ৭০ হাজার ৫০০ একর ফুট)। দফতরের এক আধিকারিক জানান, এখন জলাধারে জলস্তর কমবেশি ৪০৬ ফুট (পরিমাণে ৮৫ হাজার একর ফুট)। ওই আধিকারিকের দাবি, গত বছর এই সময়ে জলস্তর আরও ১৮ ফুট উঁচু ছিল। তিনি জানান, পুরুলিয়ায় কুমারী ও কংসাবতীর গোড়ার দিকে অগস্ট মাসের পর থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হয়নি।

ফলে জল না থাকায় বোরো চাষ তো দূরের কথা রবি চাষেও সেচের জন্য জল দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে তাঁর আশ্বাস, এপ্রিল-মে মাসে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য সেচখালে কিছুটা জল ছাড়া হবে।

কিন্তু সেচের জল না মেলায় ইতিমধ্যেই দক্ষিণ বাঁকুড়ার পাশাপাশি পশ্চিম মেদিনীপুর এবং হুগলি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার চাষের বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে সমস্যায় পড়েছেন দক্ষিণ বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকার চাষিরা। রানিবাঁধের বাসিন্দা সুরেন হেমব্রম, রাইপুরের অবনী দুলে জানান, বৃষ্টির অভাবে আমন এবং আউশ ধান ভাল হয়নি। বোরো এবং রবি চাষ করে সেই লোকসানের কিছুটা পুষিয়ে নেবেন ভেবেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেচখালে এ বার জল পাবেন না দেখে তাঁরা দুর্ভাবনায় পড়েছেন।

এই অবস্থার জন্য কংসাবতী সেচ দফতরের দিকে আঙুল তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, অগস্ট মাসে প্রথমে ভারী বৃষ্টি দেখে সেচ দফতর জলাধার থেকে জল ছেড়ে দেয়। তারপর বৃষ্টি কমে যাওয়ায় জলাধারের এই শুষ্কপ্রায় দশা হয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement