দুপুর গড়িয়ে বিকেল, পাখি কই নীল নির্জনে

জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সকাল কাবার! দুপুর নামছে ঝিলের ধারে। বাইনোকুলারটা চোখে লাগিয়ে বিস্তীর্ণ নীল, শান্ত জলাশয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত— খুঁটিয়ে দেখছিলেন মিতা দত্ত। দেখা মিলল মাত্র দু’টি বড়ি হাঁসের (বারহেডেজ গুজ়)। কিন্তু ব্রাহ্মণী হাঁস (রুডি শেলডাক), খুন্তে হাঁস (সোভেলার) বা, রাঙা মুড়ি হাঁস, ছোট রাঙামুড়ির দেখা মিলল কই!

Advertisement

দয়াল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:২৮
Share:

অধীর অপেক্ষা। কখন আসবে পাখি? জলের দিকে চেয়ে পর্যটকরা। নিজস্ব চিত্র।

জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সকাল কাবার! দুপুর নামছে ঝিলের ধারে।

Advertisement

বাইনোকুলারটা চোখে লাগিয়ে বিস্তীর্ণ নীল, শান্ত জলাশয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত— খুঁটিয়ে দেখছিলেন মিতা দত্ত।

দেখা মিলল মাত্র দু’টি বড়ি হাঁসের (বারহেডেজ গুজ়)। কিন্তু ব্রাহ্মণী হাঁস (রুডি শেলডাক), খুন্তে হাঁস (সোভেলার) বা, রাঙা মুড়ি হাঁস, ছোট রাঙামুড়ির দেখা মিলল কই! গত বছর বা তার আগের বারও এই সময়ে হাজার হাজার সংখ্যায় ওই পরিযায়ী পাখিগুলো ছিল বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জলাশয় নীল নির্জনে। এ বার আর নেই!

Advertisement

পাখির দেখা পেতে দিন কয়েক আগে দক্ষিণ কলকাতা থেকে এতটা পথ উজিয়ে এসে সত্যিই হতাশ হয়েছিলেন পেশায় চিকিৎসক মিতাদেবী। তিনি শুধু একা নন, হতাশ তাঁর সঙ্গীরাও। সেই দিন দুপুরে মিতাদেবীর সঙ্গে সপরিবার বক্রেশ্বর জলাধারে পাখি দেখতে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত আইটি সেক্টরের কর্মী প্রদীপ্ত বসু। তাঁর স্ত্রী সুমিতা ছেলে নীল বসুরাও। পাখির দেখা মেলেনি নীল নির্জনে। দীর্ঘ দিন কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালুরুতে ছিলেন প্রদীপ্তবাবু। তিনি বলছেন, ‘‘পাখি ও বন্যপ্রাণের নেশায় ওখানকার ক্লাবের সদস্যপদ নিয়েছিলাম। জানতাম ওই জলাশায়ে প্রচুর পাখি আসে কিন্তু কপাল মন্দ!’’

নীল নির্জনে পাখি দেখতে হতাশ পুলিশ আধিকারিক পার্থ ঘোষও। দিন কয়েক আগে টেলি লেন্স ও ফুল ফ্রেমের দামি ব্রান্ডের ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন পার্থবাবু। মাস কয়েক আগেও সদরের ডেপুটি পুলিশসুপারের দায়িত্বে ছিলেন। এখন ব্যারাকপুরে পোস্টিং। কিন্তু পাখির ছবি তোলার নেশা তাঁকে নীল নির্জনে টেনে এনেছিল। কিন্তু পার্থবাবুর ক্যামেরায় পাখিরা তেমন ভাবে ধরা পড়েনি।

শুধু পক্ষীপ্রেমী বা ফোটগ্রাফাররাই এই জলাশায়ে আসেন তাই নয়। ডিসেম্বরের এই সময়টায় দুবরাজপুর ও সংলগ্ন কোনও পরিবারে আত্মীয়স্বজন এলেই বিকাল বা সকালে বক্রেশ্বরের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওই জলাশয়ে বেড়াতে আসেন। শান্ত জলাশয়ে এই সময়ের মূল আকর্ষণ কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পখির দল। শুধুই কী পরিযায়ী পাখি, সঙ্গে থাকে সরাল, বালিহাঁস, নানা জাতের পানকৌরি, জলপিপি, জলময়ূরের মতো প্রচুর বাংলার পাখিও। যাদের সচরাচর দেখাও যায় না। তাদের কলতানে মুখর থাকে চারিদিক। কিন্তু এবার প্রায় ডিসেম্বর পার হয়ে গিয়েছে, জানুয়ারির প্রথমভাগেও পাখিদের দেখা সেভাবে মেলেনি। কেন এত সীমিত সংখ্যায় পাখিদের উপস্থিতি, ভেবে অবাকই হচ্ছেন স্থানীয়রা।

এ বারের বিলম্বিত শীত-ই কী পাখিদের আসার পথে প্রধান অন্তরায়?

স্থানীয়দের দাবি, রোদ ঝলমলে দিনে কখনও কখনও কিছু পাখির দেখা মিলছে। পক্ষী-বিশারদ অর্জন বসুরায় মনে করেন, ‘‘দক্ষিণবঙ্গে শীতকালীন সামগ্রিক উষ্ণতা বেশি হওয়ায় পরিযায়ী পাখি তুলনামূলক ভাবে কম এসেছে। আবার উত্তরবঙ্গে ঠান্ডা পড়ায় পরিযায়ী আসার সংখ্যায় কোনও কমতি দেখা যায়নি।’’ পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রতি বছরই অসুস্থ হয়ে বেশ কিছু পরিযায়ী পাখি মারা যায় জেলার বিভিন্ন জলাশয়ে এসে। পাখিপ্রেমীরা বলছেন, পাখির আসা কম ঝিলের জল ও আশপাশের পরিবেশ দূষিত হয়ে যাওয়াতেই ঝিলের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছে না পাখিরা। জলার পাশে ভিড়ও বাড়ছে। বাড়ছে মানুষের আনাগোনা।

ডিসেম্বর পার করে জানুয়ারির মাঝমাঝি সময়েও প্রায় ফাঁকাই রইল জলা। নিজস্ব চিত্র।

বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জলাশয়টি তৈরি হয়েছিল ২০০১ সালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই। গোপালপুর নামে একটি আস্ত গ্রাম একসময় জলাশয়ের তলায় চলে যায়। এ ছাড়াও মধুপা, ভোঁড়া, রাধামাধবপুর, মণিরামপুর মতিজাপুর মেটালা গুণ্ডোবা-সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের জমি অধিগ্রহণ করে গড়ে উঠেছে ২৬৬৭ একর বিশিষ্ট জলাশয়টি। একসময় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল ছিল। প্রাথমিকভাবে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তাতে অবশ্য একদিকে ভালই হয়েছে বলছেন প্রকৃতি প্রেমীরা। পর্যটন কেন্দ্র হলে যেভাবে পর্যটকদের যাতায়াত বাড়ত, বাড়ত জলাশয়ে নৌকা করে বিহার করার প্রবণতা বা বোটিং। তাতে বিঘ্নিত হতে পারত পাখিদের আনাগোনা।

বহু বছর ধরেই শীতকালে পাখীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল এই জলাশয়। কেউ যেন পাখিদের জলে বিরক্ত না করেন তা বাঁধের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকা নিরাপত্তা কর্মীরাই দেখাশুনা করে থাকেন। এমন কী যাঁরা জলাশয়ে মাছ ধরেন তাঁরাও সতর্ক থাকেন এ ব্যাপারে। সবকিছু অনুকুলে তারপরও এবার পাখি আসেনি। প্রায়দিনই মাছ ধরতে জলাশয়ে নামেন, কাছের মধুপা গ্রামের জয়ন্ত বাউড়ি বলছেন, সত্যিই এবার পাখি অনেক কম। অন্যবার ঠিক সামনেই শয়ে শয়ে পাখি থাকে। পাখি সেভাবে না আসায় মন খারাপ স্থানীয় বাঁধের শোলের যুবক চিরন্ত মিশ্র, পৃথা গড়াইদের। তাঁরা বলছেন, ‘‘পরিকাঠামো তেমন না থাকলেও শীতের এই সময় অনেক পিকনিক পার্টি আসে। কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা করে জলাশয়ের গভীরে যায়। তখন পাখিরা ভয়ে কিছুটা দূরে থাকে। পিকনিক পার্টি আসতে শুরু করছে জানুয়ারির গোড়া থেকে কিন্তু তার আগে পাখিগুলো এল না কেন সেটাই ভাবছি!’’

অন্যকথা বলছেন যাঁরা মাছ ধরতে নিত্য জলার নানা প্রান্ত ঘোরেন। মৎস্যজীবী বন বাউড়ি, বাউল বাউড়িরা বলেন, ‘‘পরিযায়ী পাখিরা এবার জলাশয়ের অন্য প্রান্তে এসেছে। যদিও সংখ্যায় কিছুটা কম। আর পাখি আরও আসবে, সময় এখনও যায়নি।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement