একশো দিনের প্রকল্পে পুরুলিয়ার কাজের গতিতে হতাশ নবান্ন। হাল ফেরাতে মাসখানেক আগে জেলাশাসক অলকেশপ্রসাদ রায় পঞ্চায়েতের প্রধান ও কর্মীদের জরিমানা করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তাতে প্রকল্পে খরচের পরিমাণ বাড়লেও রাজ্যের নিরিখে পুরুলিয়া কিন্তু সেই ষোড়শতম স্থানেই আটকে রয়েছে। কিছুতেই এই জেলা ওই প্রকল্পের তালিকায় উপরের দিকে উঠতে পারছে না। তাতে ক্ষুব্ধ রাজ্য প্রশাসন।
যে জেলায় কাজের অভাবে রোজগারের সন্ধানে যুবকদের ভিন্ রাজ্যে যেতে হচ্ছে, সেখানে কেন একশো দিনের প্রকল্পে মানুষকে কাজ দেওয়া যাচ্ছে না, এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে। সম্প্রতি নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেলাশাসকদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে এই প্রকল্পে পুরুলিয়ার হাল নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়।
গত এপ্রিলে পুরুলিয়া সফরে এসে একশো দিনের কাজের প্রকল্পের হাল দেখে বিরক্তি প্রকাশ করে প্রশাসনিক বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। তার পরেই শনিবার রবীন্দ্রভবনে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের জনপ্রতিনিধি ও এই প্রকল্পের আধিকারিক ও কর্মীদের নিয়ে বৈঠক করে জেলাশাসক। তিনি বলেন, ‘‘রাজ্য পঞ্চায়েত গ্রামোন্নয়ন দফতর থেকে নির্দেশ এসেছে, যে সব কাজের খতিয়ান এখনও প্রকল্পের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়নি, তা ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে করতে হবে। তা না হলে শ্রমিকেরা টাকা পাবেন না।’’
জেলাশাসক ওই বৈঠকে জানিয়ে দেন, এই প্রকল্পে আর ঢিমেতালে কাজ করা চলবে না। তিনি বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ভর্ৎসিত হতে হচ্ছে আমাদের। গত ১৬ জুলাই এই প্রকল্প নিয়ে একই ভাবে বৈঠক করে কাজের গতি বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সে দিন পর্যন্ত প্রকল্পে চলতি অর্থবর্ষে জেলায় খরচ হয়েছিল ৩৯ কোটি ৫৩.১ লক্ষ টাকা। রাজ্যের অন্যান্য জেলার নিরিখে পুরুলিয়া ছিল ষোড়শতম স্থানে। ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খরচ বেড়ে হয়েছে ৭০ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা। কিন্তু পুরুলিয়া সেই ষোড়শতম স্থানেই আটকে রয়েছে।’’ এরপরেই বৈঠকে তাঁর প্রশ্ন— ‘‘আমাদের চেয়ে ছোট যে সব জেলা রয়েছে, বা যে সমস্ত জেলায় এই কাজের সুযোগ তুলনামূলক ভাবে কম, তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে, অথচ আমরা কেন পিছিয়ে?’’ তিনি জানান, জেলার ২৫ লক্ষ মানুষ নেহাত দু’টাকা কেজি দরে চাল পান, না হলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত।
তবে এর মধ্যে আশার কথা এটাই, এই প্রকল্পে পরিবার পিছু কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে পুরুলিয়ার। জুলাইয়ে পুরুলিয়া রাজ্যের গড় কর্মদিবসের (২৭ দিন) থেকে পিছিয়ে ছিল (২৩ দিন)। স্থান ছিল ১৪তম স্থানে। দু’মাসে ওই ক্ষেত্রে পুরুলিয়া (৩৩.৭ দিন) রাজ্যের গড়কে (৩২.৫) টপকে গিয়েছে। উঠে এসেছে নবম স্থানে।
বৈঠকে কেউ কেউ তোলেন— চাষের মরসুম চলায় ১০০ দিনের প্রকল্পে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। জেলাশাসক পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, কৃষি দফতর জানাচ্ছে, জেলায় ২ লক্ষ ২৭ হাজার হেক্টর কৃষি জমি রয়েছে। সেই জমিতে ধান লাগানোর কাজে এক লক্ষ লোকের প্রয়োজন। তাহলে জেলায় যে পাঁচ লক্ষ 38 হাজার জবকার্ড রয়েছে, তাঁরা কোথায় কাজ করছেন? সবাই তো চাষের কাজ করছেন না।’’
উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, বরাবাজারের বেড়াদা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় গিয়ে তাঁকে স্থানীয় মহিলাদের কাছে শুনতে হয়েছে, পঞ্চায়েত থেকে তাঁদের ১০০ দিনের প্রকল্পে কাজ দেওয়া হয়নি। চাহিদা থাকলেও কেন কাজ দেওয়া হবে না? ক্ষুব্ধ জেলাশাসক বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলছেনস কাজের সুযোগ পুরুলিয়াতেই সব থেকে বেশি। আর আপনারা কাজ দিতে পারছেন না, লজ্জা করে না?’’
জেলা পরিষদের সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতো বলেন, ‘‘কাজ না দিয়ে আপনারা মানুষকে বঞ্চিত করছেন। এটা কোনও ভাবেই মানব না।’’ বান্দোয়ানের এক নির্মাণ সহায়ক অভিযোগ তোলেন, জনপ্রতিনিধিরা প্রত্যক্ষ ভাবে সহায়তা না করলে কাজের গতি বাড়ানো যাবে না।
এ কথা শুনে সভাধিপতি বলেন, ‘‘কোথায় কোথায় কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন আমাকে জানাবেন। কিন্তু কাজ করতে হবে, ঢিলেমি মানা হবে না।’’