যে সাইনবোর্ডের কথা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের এতদিন কেউ জানতেন না বলে দাবি। —নিজস্ব চিত্র।
লোকজনের চোখের আড়ালে এতদিন দিব্যি বোর্ড দিয়ে ঢাকা ছিল। কিন্তু বেআইনি দখলদার উচ্ছেদ হতেই বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে বেরিয়ে পড়ল পুরসভার বরাদ্দ অর্থে ২৭ লক্ষের শৌচালয় তৈরির বোর্ড। সেই বোর্ডে লেখা অনুযায়ী, এত দিন কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হাসপাতাল ঘুরেও এমন ‘মহার্ঘ শৌচালয়’ কোথাও চোখে পড়েনি। চক্ষু চড়কগাছে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের। তৃণমূল পরিচালিত পুর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
২০১১ সালের আগে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের মূল ফটকের উল্টো দিকে মেডিক্যাল কলেজের একটি ভবনে ‘স্ক্যান সেন্টার’ ছিল। সে বার বিধানসভা নির্বাচনের পর স্ক্যান সেন্টারটি মেডিক্যাল কলেজের অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হয়। তখন পরিত্যক্ত ভবন দখল করে ব্যবসা শুরু করেন এক ব্যবসায়ী। অভিযোগ, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতির তোয়াক্কা করা হয়নি। আরও অভিযোগ, স্থানীয় এক তৃণমূল নেতার মদতে খাবারের দোকান বসে।
হাসপাতালের ভিতরে যাতায়াতের পথে এই দোকান সকলের নজরে আসাই স্বাভাবিক। কিন্তু নেতার দাপটে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেননি বলে দাবি মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের। রাজ্যে আবার রাজনৈতিক পালাবদলের পর ওই ব্যবসায়ীকে উঠে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতেই ভবনের সামনে এত দিন ঢাকা পড়ে থাকা বাঁকুড়া পুরসভার একটি সাইনবোর্ড দেখতে পাওয়া যায়। তাতে লেখা রয়েছে, শৌচালয় নির্মাণের জন্য মিশন নির্মল বাংলা প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়েছে মোট ২৭ লক্ষ ৭৮ হাজার ৩৪১ টাকা। নির্মাণের তারিখ ২৬ নভেম্বর ২০২৫ সাল। শৌচালয় নির্মাণের জন্য বরাতপ্রাপ্ত সংস্থাকে সময় দেওয়া হয়েছে ৯০ দিন। বোর্ডের এক কোণে কিউআর কোড রয়েছে। যেটি স্ক্যান করলে প্রকল্পের তথ্য আরও বিশদে পাওয়ার কথা। কিন্তু স্ক্যান করে কোনও তথ্যই মিলছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে হাসপাতালের লোকজনের দাবি, এমন বোর্ড যে রয়েছে, সেটিই তাঁদের অজানা ছিল। বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পঞ্চানন কুণ্ডু বলেন, ‘‘মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে কোনও নির্মাণকাজ করতে চাইলে মেডিক্যাল কলেজের কাছে আগাম অনুমতি নেওয়ার কথা। কিন্তু এই শৌচালয় তৈরির জন্য অনুমতি নেওয়া হয়নি। কে বা কারা মেডিক্যাল কলেজের নিজস্ব জায়গায় এই বোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে গিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে।’’
বাঁকুড়া পুরসভার বিরুদ্ধে শৌচালয়ের নাম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সরব হয়েছেন স্থানীয়েরা। সন্তোষ পাণ্ডে নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘‘আমরা নিশ্চিত যে, শুধুমাত্র বোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে শৌচালয়ের জন্য বরাদ্দ বিশাল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করে নিয়েছে তৃণমূল পরিচালিত বাঁকুড়া পুরসভা। অবিলম্বে এই ঘটনার তদন্ত হওয়া জরুরি।’’
বাঁকুড়ার বিধায়ক নীলাদ্রিশেখর দানার মন্তব্য, ‘‘কে বা কার মদতে এত দিন সরকারি সম্পত্তি বেদখল হয়েছিল তা যেমন তদন্ত করে দেখা হবে, তেমনই এই শৌচালয়ের জন্য বরাদ্দ টাকা কার পকেটে ঢুকেছে সেটাও খতিয়ে দেখা হবে।’’ বাঁকুড়ার পুরপ্রধান অলকা সেন মজুমদারের সাফাই, ‘‘মিশন নির্মল বাংলা প্রকল্পে ওই এলাকায় একটি শৌচালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একটি সংস্থা ওই শৌচালয় নির্মাণের বরাতও পেয়েছিল। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশে ওই শৌচালয়ের নির্মাণকাজ স্থগিত রাখা হয়। প্রকল্পে কোনও বেনিয়ম হয়নি। গোটা ঘটনা নিয়ে তদন্ত হলে আমি পূর্ণ সহযোগিতা করব।’’