বাঁকুড়ায় ফুটন্ত ঘিয়ে হাত ডুবিয়ে পিঠে ভাজছেন ভাইয়েরা। — নিজস্ব চিত্র।
সাড়ে তিনশো বছর আগে শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সাত ভাইয়ের জন্য কঠোর ব্রত পালন করেছিলেন একমাত্র বোন। বোনের আত্মত্যাগ ও তপস্যার জেরে শেষ পর্যন্ত বাড়িতে ফেরেন বন্য প্রাণীর আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত সাত ভাই। বোনের সেই আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে, তাঁর মঙ্গলকামনা করে কঠোর ব্রত পালন শুরু করেন বাঁকুড়ার পাকুড়ডিহা গ্রামের সাত ভাই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্রতে সামিল হন গ্রামের অন্যান্য আদিবাসী যুবকেরাও। প্রাচীন সেই রীতি মেনে আজও মাঘের নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের আদিবাসী যুবকেরা ফুটন্ত ঘিয়ে হাত ডুবিয়ে গুড়পিঠে ভেজে কৃচ্ছসাধনের ব্রত করেন বোনদের জন্য।
বাঁকুড়ার তালড্যাংরা ব্লকের পাকুড়ডিহা গ্রামে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০টি পরিবারের বসবাস। কথিত রয়েছে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে গ্রামে সাত ভাই এবং তাঁদের একমাত্র বোন বসবাস করত। পেটের তাগিদে সাত ভাই এক দিন সকালে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে শিকারে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। জঙ্গলের ভিতরে হিংস্র জন্তুর আক্রমণে ওই সাত ভাই মারা গিয়েছেন বলে আশঙ্কা হয় বোনের। ভাইদের ফিরে আসার কামনায় কঠোর ব্রত রেখে তপস্যা শুরু করেন বোন। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস বোনের সেই আত্মত্যাগের জেরে কিছুদিন পরে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় হলেও প্রাণে বেঁচে বাড়িতে ফেরেন সাত ভাই।
তার পর থেকে সাত ভাই পাল্টা কৃচ্ছ্রসাধনের পথ বেছে নেয়। সারা পৌষ মাস ধরে নিরামিষ খাবার খেয়ে বিভিন্ন আচার পালন শুরু করেন তাঁরা। পাশাপাশি মাঘ মাসের নির্দিষ্ট একটি দিনে পাকুড়ডিহার মাঠে গিয়ে বোনের মঙ্গল কামনায় ফুটন্ত ঘিয়ে হাত ডুবিয়ে গুড় পিঠে ভাজার রীতি পালন করেন ওই সাত ভাই। ধীরে ধীরে সাত ভাইয়ের সেই ব্রতে শামিল হন গ্রামের অন্যান্য যুবকেরাও। কালে কালে পাকুড়ডিহা গ্রামের যুবকদের এই রেওয়াজের কথা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। লোকজন ব্যতিক্রমী এই রেওয়াজ দেখতে মাঘ মাসের ওই নির্দিষ্ট দিনে ভিড় জমাতে শুরু করেন পাকুড়ডিহা গ্রামের মাঠে। শুরু হয় মেলা।
পাকুড়ডিহা গ্রামের বাসিন্দা চুড়ারাম মান্ডি বলেন, ‘‘আমাদের গ্রামে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতি চলে আসছে।’’ উৎসব দেখতে আসা তালড্যাংরার বাসিন্দা প্রবীর ঘোষ বলেন, ‘‘বাঁকুড়া জেলায় আদিবাসী গ্রামের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু কোনও গ্রামেই এমন উৎসবের নজির নেই। অন্য কোনও ধর্ম বা জাতির মানুষের মধ্যেও এমন উৎসবের রেওয়াজ চোখে পড়ে না। ভিন্নধর্মী এই উৎসব দেখতে তাই প্রতি বছরই পাকুড়ডিহা গ্রামে আসি।’’