বাঘমুণ্ডি ব্লক সভাপতির সিদ্ধান্তে অসন্তোষ

‘আমরাই ব্রাত্য’, বিক্ষোভ তৃণমূল অফিসে

অসন্তোষের চোরা স্রোত বইছিলই। ব্লক কমিটি গড়া নিয়ে ফের বিক্ষোভ আছড়ে পড়ল তৃণমূলের জেলা দফতরে। ঝালদা ২ ব্লকের পরে এ বার পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের আর এক ব্লক বাঘমুণ্ডি। একই সঙ্গে সামনে এসে গেল ‘নব্য’ বনাম ‘পুরনো’ তৃণমূলের চেনা দ্বন্দ্বও। ঝালদা ২ ব্লকের তৃণমূল সভাপতির বদল চেয়ে সেখানকার দলীয় কর্মীদের একাংশ কয়েক মাস আগে সরাসরি জেলা দফতরে এসে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০১৫ ০২:২৮
Share:

পুরুলিয়া শহরে জেলা কার্যালয়ে ভিড় বাঘমুণ্ডির তৃণমূল কর্মীদের। রবিবার। — নিজস্ব চিত্র

অসন্তোষের চোরা স্রোত বইছিলই। ব্লক কমিটি গড়া নিয়ে ফের বিক্ষোভ আছড়ে পড়ল তৃণমূলের জেলা দফতরে। ঝালদা ২ ব্লকের পরে এ বার পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের আর এক ব্লক বাঘমুণ্ডি। একই সঙ্গে সামনে এসে গেল ‘নব্য’ বনাম ‘পুরনো’ তৃণমূলের চেনা দ্বন্দ্বও।

Advertisement

ঝালদা ২ ব্লকের তৃণমূল সভাপতির বদল চেয়ে সেখানকার দলীয় কর্মীদের একাংশ কয়েক মাস আগে সরাসরি জেলা দফতরে এসে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। একই পথে হাঁটলেন বাঘমুণ্ডির তৃণমূল কর্মীরা। রবিবার তাঁরা পুরুলিয়া শহরে দলের জেলা কার্যালয়ে এসে বিক্ষোভ দেখালেন। তাঁদের ক্ষোভ, কর্মীদের সঙ্গে কোনও রকম আলোচনা না করে পাঁচটি অঞ্চলের (গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা) সভাপতি বদল করা হয়েছে। এত দিন যাঁরা তৃণমূলের বিরোধিতা করেছেন, ব্লক সভাপতি তাঁদেরই ‘জামাই আদরে’ ব্লক কমিটিতে ঠাঁই দিয়েছেন। এমনকী, ব্লক সভাপতি এলাকায় ‘হিটলারি শাসন’ চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ বিক্ষুব্ধ কর্মীদের।

বাঘমুণ্ডি এমনিতেই জেলা তৃণমূলের কাছে ‘ব্যথার জায়গা’। এখানকার বিধায়ক জেলা কংগ্রেস সভাপতি নেপাল মাহাতো। শাসকদলের হাজার চেষ্টাতেও বাঘমুণ্ডিতে তারা দাঁতা ফোটাতে পারেনি সেভাবে। বিধানসভার পরে পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনেও বাঘমুণ্ডিতে ভাল ফল হয়নি তৃণমূলের। মাস দেড়েক আগে সমবায় ভোটেও ভরাডুবি হয়েছে তাদের। উল্লেখ্য, যুব তৃণমূল সভাপতি তথা পুরুলিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত ৮ সেপ্টেম্বর পুরুলিয়ায় একটি কর্মিসভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, পুজোর পরে তিনি জেলায় এসে বাঘমুণ্ডিতে গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বলেছিলেন, আগামী বিধানসভা ভোটে বাঘমুণ্ডি ‘উদ্ধার’ করতে হবে। চলতি মাসের শেষের দিকে অভিষেকের বাঘমুণ্ডিতে বৈঠক করার কথা রয়েছে বলে দল সূত্রের খবর। তার আগে দলীয় কর্মীদের এ হেন প্রকাশ্য বিক্ষোভে জেলা তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি বাড়িয়েছে।

Advertisement

এ দিন বিকেলে গাড়িতে করে বাঘমুণ্ডির কয়েকশো তৃণমূল নেতা-কর্মী শহরের বি টি সরকার রোডে জেলা তৃণমূল দফতরে আসেন। দফতরের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁরা ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ’, ‘টাকা নিয়ে সভাপতি পদ দেওয়া হচ্ছে কেন জেলা সভাপতি জবাব দাও’, ‘ব্লক সভাপতির ফতোয়া চলবে না’— এই সব স্লোগানও দিতে থাকেন বিক্ষুব্ধরা। তাঁদের হাতে দলনেত্রীর ছবি সংবলিত পতাকা ছিল। সুধীর গোপ, বিজয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মেঘনাথ মাহাতোর মতো বাঘমুণ্ডির নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সুইসা-তুন্তুড়ি, বুড়দা-কালিমাটি, সিন্দরি, মাঠা ও বীরগ্রাম এই পাঁচটি অঞ্চলের অঞ্চল সভাপতি আচমকা বদলে দেওয়া হয়েছে। অথচ অঞ্চল সভাপতি বদলানো হবে না বলে জেলা সভাপতি তাঁদের কথা দিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি, ‘‘জেলা সভাপতির আশ্বাস সত্ত্বেও আমাদের ব্লক সভাপতি গয়াসুর মাঝি নিজের ইচ্ছেমতো কমিটি গড়েছেন দলীয় কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা না করেই।’’

একই সঙ্গে ওই নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ, জেলায় দলের প্রথম ‘শহিদ’ বাঘমুণ্ডিরই প্রধান সিং মুড়া। তিনি বামফ্রন্টের আমলে দুর্নীতি নিয়ে সরব হওয়ায় প্রকাশ্যে নৃশংস ভাবে খুন হয়েছিলেন। আজ ব্লক সভাপতি সে সময় যাঁরা এই এলাকায় শাসক দলের কর্ণধার ছিলেন, তাঁদেরই জামাই আদরে ব্লক কমিটিতে আশ্রয় দিয়েছেন। মেঘনাথ মাহাতো বলেন, ‘‘ফরওয়ার্ড ব্লকের সেই সময়কার অনেক নেতা-কর্মীরাই আজ আমাদের দলে নেতা। অথচ আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছি। আজ আমরাই দলে ব্রাত্য হয়ে গেলাম!’’ এর বিচার চাইতেই তাঁরা সারাসরি জেলা দফতরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধেরা। তাঁদের আরও অভিযোগ, বীরগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূলের টিকিটে দু’জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু, ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় ওই দুই সদস্য তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ‘‘চক্রান্ত করে এখানে দলটাকে আমাদের এক শ্রেণির নেতৃত্ব কংগ্রেসের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন। আমরা তা হতে দেব না বলেই এসেছি।’’— স্পষ্ট বলছে বিক্ষুব্ধ শিবির।

Advertisement

দলীয় কার্যালয়ে এসে জেলা সভাপতি শান্তিরাম মাহাতোকে না পেয়ে তাঁরা এ দিন কার্যালয়ে বসে পড়েন। কর্মীদের অভিযোগের জবাবে বাঘমুণ্ডির ব্লক সভাপতি গয়াসুরবাবু দাবি করেন, তিনি সেই সব অঞ্চলের সভাপতিদের বদল করেছি যেখানে, গত দু’টি নিবার্চনে (পঞ্চায়েত ও লোকসভা) ফল খুব খারাপ হয়েছে। তাঁর যুক্তি, ‘‘এখানে বিধায়ক কংগ্রেসের। পঞ্চায়েত সমিতিও কংগ্রেসের। কংগ্রেস থেকে তো লোকজন আমাদের দলে আসবে না। তাই ফ ব থেকেই লোকজন আমাকে নিতে হবে। কারণ। এই বিধানসভা আসনটি পরের ভোটে আমাদের উদ্ধার করতে হবে।’’ তিনি দলে একাধিপত্য চালাচ্ছেন, এই অভিযোগের জবাবে তিনি জানান, অভিযোগ থাকলে বা কোনও বক্তব্য থাকলে সরাসরি তাঁকেই জানাতে পারেন কর্মীরা। বাঘমুণ্ডিতে দলের অফিসও আছে। তার জন্য জেলা দফতরে যেতে হবে কেন, প্রশ্ন ব্লক সভাপতির।

তৃণমূলের জেলা নেতা সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কেন ওখানকার কর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি জেলা দফতরে চলে এলেন, তা নিয়ে আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলব। তবে দলীয় শৃঙ্খলার দিকটিও সকলের দেখা দরকার।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement