পর পর বাড়ি গড়ে উঠছে উপনগরীতে। রবিবার সকালে ছবিটি তুলেছেন বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী।
পর্যটন মানচিত্রে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাপ বাড়ছিল বোলপুর শহরের উপরে। রেল স্টেশন থাকায় সম্ভাবনা বাড়ছিল প্রান্তিকেরও। আর এই দুইয়ের যোগসূত্রেই গড়ে উঠল প্রান্তিক উপনগরী। অল্প দিনেই বাইরের লোকেদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠল গোটা এলাকা।
১৯৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর বোলপুরে গঠিত হয় শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদ। এই সরকারি সংস্থার লক্ষ্য ছিল মৌজাগুলির সার্বিক উন্নয়ন। স্থানীয় প়ঞ্চায়েত এবং শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদ (এসএসডিএ) প্রান্তিক স্টেশনকে ঘিরে জনবসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে। ঠিক হয়, স্টেশনের পূর্ব দিকে তৈরি হবে একটি উপনগরী। পশ্চিম দিকে রূপপুর পঞ্চায়েত এলাকায় ছিল তালতোড় মাঠ। সেখানেও ব্যক্তি মালিকানাধীন ঘর-বাড়ি তৈরির কথা ভাবা হয়। সেই সময় শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদের সভাপতি ছিলেন বোলপুরের তৎকালীন সাংসদ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। সাংসদ-ঘনিষ্ঠদের দাবি, প্রান্তিকের ক্রসিং-এ দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়িগুলি থেকে চুরি আটকানোও এই পরিকল্পনার বড় কারণ।
যত দিন গিয়েছে, শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে প্রান্তিক এলাকার। এসএসডিএ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ নাগাদ রেল লাইনের পূর্ব দিকে উপনগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়। তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে কাজ শুরু হতে সময় লাগে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর অবধি। জমি অধিগ্রহণ করে, প্রায় সাড়ে তিনশো প্লট করা হয়। তার পর লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ক্রেতাদের কাছে সেগুলি বিক্রি করা হয়।
প্রান্তিক স্টেশনে বিদ্যুৎ সংযোগ আসে ১৯৮৬ সালে। রেল স্টেশন-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন কয়েক জনের দাবি, এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মারটি স্টেশনের বাইরে বসানো হয়েছিল। এর কিছু দিন পরে এলাকায় একটি হোটেল বানান অসমের এক ব্যবসায়ী।
এসএসডিএ সূত্রে জানা যায়, এখন প্রান্তিক উপনগরীতে রয়েছে কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, কমিউনিটি হল এবং ৩টি পার্ক। আছে নিজস্ব জলাধার। সেখান থেকে দিনে তিন বার জল সরবরাহ করা হয়। বাড়ি বাড়ি আবর্জনা সংগ্রহ করার ব্যবস্থা-সহ বিভিন্ন আধুনিক নাগরিক পরিষেবাও পান এখাকার নাগরিকরা।
প্রান্তিক উপনগরীর বাসিন্দা সিঁথি ভট্টাচার্য, শ্যামলী মণ্ডল, স্বপ্না মজুমদারদের খেদ অবশ্য অন্য বিষয়ে। তাঁরা জানান, এলাকার ৩৫০টি প্লটের মধ্যে প্রায় শ’ দু’য়েকে ঘর-বাড়ি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেগুলির মধ্যে সাকুল্যে ৬০টি বাড়িতে সারা বছর লোকজন থাকে। বাদবাকি বাড়িগুলির মালিকরা আসেন বসন্ত উৎসব বা পৌষ মেলার সময়। অথবা, বড়জোর সপ্তাহান্তে ছুটি কাটাতে।
এসএসডিএ সূত্রে জানা গিয়েছে, উপনগরীর বাসিন্দারা আগে কেবল রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে জমি হস্তান্তর করতে পারতেন। ইদানিং নিয়ম বদলেছে। এখন অবাধে জমি হস্তান্তর করা চলে। এলাকার লোকেরা জানান, এর ফলে উপনগরীতে সারা বছর পাকাপাকি ভাবে বসবাস করার লোকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। উপনগরীর কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি ক্রেতার অভাবে বেশি দিন চলেনি। সেখানে এখন নেতাজি মুক্ত বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল পঠন পাঠন হচ্ছে। কমিউনিটি হলটিতেও একটি নির্মীয়মাণ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের ক্লাস হয়। তবে বেসরকারি উদ্যোগে এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি ইংরাজি মাধ্যম স্কুল, একটি চক্ষু চিকিৎসা কেন্দ্র-সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
অন্য দিকে, প্রান্তিক পশ্চিমে রয়েছে ১৭০টির মতো বাড়ি। সেখানকার বাসিন্দা, পেশায় চিকিৎসক প্রণবকুমার সরকার জানান, অনেক বয়স্ক মানুষ বসবাস করেন এই এলাকায়। তিনি অভিযোগ করেন, নাগরিক পরিষেবার কিছুই এখানে নেই। রয়েছে জলের কষ্ট। রাস্তাঘাট আর আলোর অবস্থাও খারাপ।
স্থানীয় লোকেদের থেকে জানা যায়, প্রান্তিক পশ্চিমে বাড়ি রয়েছে প্রাক্তন ফুটবলার সুভাষ ভৌমিক, মোহনবাগানের সম্পাদক অঞ্জন মিত্র এবং কোষাধ্যক্ষ দেবাশিস দত্তর মতো অনেকের। অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, আইএএস, আইপিএসরাও এখানে থাকেন। এলাকার বাসিন্দা গীতাদেবীর অভিযোগ, ‘‘গত মে মাস থেকে টেলিফোন খারাপ। ব্রডব্যান্ডও কাজ করছে না। ঠিক মতো জলের জোগান নেই’’। স্থানীয় বাসিন্দা অর্ধেন্দুশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, কিশোর পালদের দাবি নিকাশি নালা, আলো এবং চওড়া রাস্তার। তাঁরা অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর পানীয় জলের সংকটে ভুগে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে নিজেদেরই পাম্প বসিয়ে নিতে হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাপারে বারে বারে আর্জি জানিয়েও কোনও ফল মেলেনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ময়ূরাক্ষী সাউথ ক্যানালের উপর সেতু করে গনুটিয়া থেকে সুরুল অবধি রাস্তা বানানোর পরিকল্পনা হয়েছিল। এর ফলে শান্তিনিকেতন যাওয়ার দুরত্ব অনেক কমে যেত। পাশাপাশি সিউড়ি থেকে লাভপুর এবং রাজগ্রাম যাওয়ারও অনেক সুবিধা হতো। তাঁদের অভিযোগ, সেই পরিকল্পনা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বোলপুরের বিডিও শমিক পাণিগ্রাহী এবং এসএসডিএ-র নির্বাহী আধিকারিক নির্মাল্য ঘরামি জানান, নাগরিক পরিষেবাকে আরও উন্নত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নেওয়া হচ্ছে।