জয়নাল আবেদিন।
বেলা সাড়ে ১১টা। গোটা গ্রাম থমথমে। লোকজনের চোখেমুখে শুধু উৎকণ্ঠা। মঙ্গলবার পাড়ুই থানায় কসবা পঞ্চায়েতের খিরুলি গ্রামের পরিবেশটাই এরকম ছিল।
বিচারক কী রায় শোনান, তা জানার জন্য সকাল সকাল শিশুকন্যাকে নিয়ে বর্ধমানের মঙ্গলকোটে শ্বশুরবাড়ি থেকে খিরুলি গ্রামের মাঝপাড়ায় বাপেরবাড়িতে পৌঁছেছেন নিহতের ভাইঝি জাহিরুন্নেসা বেগম। সমানে বেজে চলেছে নিহত জয়নাল আবেদিনের স্ত্রী জাহানারা বেগমের মোবাইল ফোন। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-পরিজন তো আছেনই, সুদুর রাঁচি থেকে বার চারেক ফোন করেছেন সিআরপিএফ-এ কর্মরত ছেলে শেখ জাভেদ জামালও। টিভির দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে চোখের জল মুছছেন স্ত্রী জাহানারা। সোমবার সকাল থেকেই কার্যত রান্নাবান্না বন্ধ অধিকাংশ ঘরে। সাজা শোনার পরে কান্না থামিয়ে নিহতের ছোট ভাই শেখ জহিরুদ্দিনের স্ত্রী ফিরোজা বেগম বললেন, “সপরিবারে এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বিচারকের রায়ে আমরা খুশি। তবে মৃত্যুদণ্ড হলে আরও ভাল হত।”
প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে গ্রামের হরিমোড়ল পুকুর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন বছর ৪০-এর জয়নাল আবেদিন। পথে গ্রামেরই ৩৭ জন রড, লাঠি, টাঙি ও বোমা নিয়ে জয়নালের উপর চড়াও হয়ে বেধড়ক মারতে শুরু করে। খবর পেয়ে জয়নালকে বাঁচাতে এসে বোমার আঘাতে জখম হন এক ভাই কাদের মোল্লা। একই সময়ে বাসে করে সাত্তোর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাচ্ছিলেন নিহতের বোন দিলেরা বেগম। দাদাকে মারধর করছে শুনে কাজে না গিয়ে সোজা থানায় যান তিনি। ঘটনাস্থল থেকে ৯ জনকে অস্ত্র-সহ ধরে পুলিশ।
প্রিজন ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সাজাপ্রাপ্তদের। মঙ্গলবার সিউড়ি
আদালত চত্বরে ছবিটি তুলেছেন তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিহতের ভাইঝি জাহিরুন্নেসা বেগম বললেন, “আমার এবং আমার জেঠুর মেয়ে আজমিরা খাতুন তখন বেরগ্রামপল্লি সেবা নিকেতন বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম। শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানের জন্য আমি এবং দিদি তৈরি হচ্ছিলাম। আগের রাতে জেঠু আমাদের অনুষ্ঠান আছে বলে ব্রতচারি নাচের সাজ গোজের জিনিসপত্র কিনে এনেছেন। দিদি তখন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। হঠাৎ ওই দিন সকালে বাড়ির অদূরে বোমার শব্দ শুনতে পাই। তখনও আমি জানি না জেঠু আমাদের অনুষ্ঠান দেখার জন্য আর কোনও দিন যেতে পারবেন না। নৃশংস ভাবে খুন করেছিল ওরা। এমনকী ওই সঙ্কটজনক অবস্থায় জেঠু জলের জন্য হাহাকার করছিল। কিন্তু যে জল দিতে গিয়েছে, তাকে ধরে মেরছে ওরা। কত কটূ কথা, প্রতিনিয়ত প্রাণে মারার হুমকি সব কিছু আমরা মুখ গুঁজে সহ্য করেছি।” তাঁর কথায়, “ন্যায় বিচার পেতে প্রায় ১৯ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।”
এ সব কথা শুনতে শুনতে টিভির পর্দায় ভেসে এল বিচারকের নির্দেশের কথা। দোষী সাব্যস্তদের প্রিজনভ্যান থেকে নামানোর ছবি দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না নিহতের স্ত্রী। তিনি বলেই ফেললেন, “ছেলেমেয়েকে নিয়ে চা খাব বলে ওই দিন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিছু পরে বিকট বোমার আওয়াজ। পর পর বোমার শব্দ। দেওর শেখ জহিরুদ্দিন বাড়িতে ছিলেন না। শব্দ শুনে বাড়িতে এসে জানান, গ্রামে খুব ঝামেলা লেগেছে। তখন আমি জা-কে বলছিলাম, তোমার দাদা বাইরে ওই মাঠের দিকে গিয়েছেন। পরে জানতে পারলাম ওই আক্রমণের শিকার হয়েছে।” তিনি জানান, দুষ্কৃতীরা কাদা মাখা মাখি অবস্থায় পশুর মতো টেনে এনে তাঁকে বাড়ি লাগোয়া এলাকায় ফেলে চলে যায়। পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা-গুলি ছোড়ে তারা। আক্ষেপ, “ও গ্রামের সকলকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছিল। যার খেসারত দিতে হল এই ভাবে।”
রায় শুনতে শুনতে চোখের জল মুছছেন নিহতের স্ত্রী জাহানারা বেগম।
খিরুলি গ্রামে ছবিটি তুলেছেন বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী।
এ দিকে, সাগর ঘোষ খুনের মামলার অভিযুক্তদের মধ্যে ১৪ নম্বরে নাম থাকা শেখ সাজমানের প্রসঙ্গ তোলা মাত্রই পড়শিরা জানালেন, শুধু ওই মামলা কেন, এলাকার এবং বাইরের বেশির ভাগ অসামাজিক কাজকর্ম ও অপরাধের সঙ্গে এরাই জড়িত। সাক্ষ্যদানকারী শেখ শওকত বলেন, “খুব ভাল লোক ছিলেন জয়নাল আবেদিন। ওই দিনের গোটা ঘটনার কথা বিচারককে জানিয়েছে।” সাজমানের প্রসঙ্গে হৃদয় ঘোষ বলেন, “আমরা তো আগেই বলেছি, অপরাধীরা এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ তাদের পুলিশ ধরছে না।” এ দিন সাজাপ্রাপ্তদের বাড়িতে কাউকে ডেকে পাওয়া যায়নি। বিচারকের রায় শোনার পরে স্বামীর সাদাকালো ছবির দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইলেন স্ত্রী জাহানারা।