নদী ভাঙনে গ্রাম। আয়াস পঞ্চায়েতের দেবগ্রামের ছবি। নিজস্ব চিত্র।
মাঠের আলপথ ভেঙে গরু নিয়ে গ্রামের দিকে হাঁটছিলেন বছর চল্লিশের যুবক আব্দুল রহমান। গরু ডাকানোর ছোট লাঠি দিয়ে দূর থেকে যে জায়গাটা দেখালেন তিনি, সেই ৩০ শতক জায়গার উপর একসময় ছিল তাঁর বাস্তু ভিটে। শিশু, সোনাঝুড়ি, নিম গাছের জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গা ছেড়ে পেশায় ক্ষুদ্র চাষি আব্দুল এখন সপরিবারে থাকেন নিজের গ্রাম দেবগ্রাম থেকে প্রায় ১ কিমি দূরে লম্বদরপুরে।
২০০০ সালের বন্যার সময় একরাতের বৃষ্টিতে গ্রাম সংলগ্ন ব্রাহ্মণী নদী ভাঙনের জল গ্রামে ঢুকে পড়ায় আব্দুলের বসতবাড়ি পড়ে যায়। ৫টি গরু, ৮ কুইন্টাল গম, ৩ কুইন্টাল সরিষা, ৪০ কুইন্টালের বেশি ধান জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল। ভিটে মাটি হারিয়ে বাবা-মার সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আপাত উঁচু জায়গার সন্ধানে চলে আসেন তিনি। পরে লম্বদরপুরে বসতি স্থাপন করলেও জন্মভিটের জন্য এখনও মন খারাপ করে আব্দুল রহমানের। আব্দুল বলছিলেন, ‘‘এক রাতের বানে সব চলে গেল। জল ঢুকে পড়েছিল, জানে বেঁচে গিয়েছি।’’
এত গেল আব্দুল রহমানের জন্মভিটের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার কাহিনি। রামপুরহাট থানার অধীন রামপুরহাট ১ পঞ্চায়েতের আয়াষ পঞ্চায়েতের দেবগ্রাম, নাছিয়া গ্রামের প্রায় পঞ্চাশটির বেশি পরিবার নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে অন্যত্র বাস করছেন। আর যে তিনশোটি পরিবার এখনও ওই দুটি গ্রামে বসবাস করছে তাঁদের অবস্থা জানাতে গিয়ে দেবগ্রামের বাসিন্দা, ষাটোর্দ্ধ পেশায় ক্ষুদ্র চাষী নুর আলাম বললেন, ‘‘আমরা ডুবছি, মরছি, আবার উঠছি।’’
নদী ভাঙনের কবলে পড়ে এরকমই নিজেদের অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন রামপুরহাট থানার দেবগ্রাম, নাছিয়া গ্রামের বাসিন্দারা। আয়াষ পঞ্চায়েতের সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তা ধরে দেবগ্রামের পশ্চিম প্রান্তে দেখা গেল নদী ভাঙনের চিত্র। গ্রামের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র থেকে দশ মিটার দূরত্বে নদীর পাড় ভেঙে পড়ে আছে। ২০০০ সালের বন্যার পর গ্রামবাসী দেখেছে দেবগ্রাম নাছিয়া গ্রামের ইদগাহ তলার কাছে নদীর পাড় বোল্ডার দিয়ে বাঁধা হয়েছিল। পরবর্তীতে দেবগ্রাম অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র থেকে দশ মিটার দূরত্বের পর আর নদী পাড় বাঁধানো হয়নি।
গ্রামবাসী বাকবুল হোসেন, মদেশ্বর হোসেনরা জানালেন, দেবগ্রাম থেকে নাছিয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণী নদীর উত্তর পাড় বোল্ডার দিয়ে বাঁধানোর জন্য সেচ দফতর থেকে জেলাপরিষদ ব্লক অফিস থেকে পঞ্চায়েত অফিস সমস্ত জায়গায় জানিয়েও এখনও পর্যন্ত করে তুলতে পারা যায়নি। অথচ প্রতিবছর নদীতে জল বাড়লে নদীর ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রামের ভিটে মাটি। বাকবুল হোসেন বলেন, ‘‘নদী ভাঙন রোধ করতে না পারার জন্য নদী গহ্বরে গ্রামের সীমানায় প্রতিবছর একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বর্ষায় গ্রামের মানুষদের প্রাণ হাতে নিয়ে বাস করতে হয়।’’
নাছিয়া গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম, দেবগ্রামের বাসিন্দা মুজিবর রহমান জানালেন বন্যার সময় গ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তাও নাই। গ্রামের একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা আয়াষ থেকে চামটিবাগান রাস্তা এখনও পাকা হয়নি। গ্রামবাসীদের হিসাব অনুযায়ী ২০০০ সালের বন্যার পর থেকে প্রায় সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ টির বেশি গ্রামছাড়া হয়ে লম্বদরপুর, রাণীনগর গ্রামে বসবাস করছে।
তাহলে নদী ভাঙনের কবলে পড়েও কেন এখনও ভিটে মাটি আগলে পড়ে আছেন? গ্রামবাসীরা জানালেন, এখানকার জমি ২০ হাজার টাকা কাঠা। অন্যত্র জমি কিনতে গেলে ২ লক্ষ টাকা কাঠা জমির দর। তাই গ্রামে জল ঢুকে ঘর বাড়ি ভেঙে পড়লেও আবার নতুন করে তৈরি করে নেয় তারা। নদী ভাঙনের অস্তিত্ব বিপন্ন দেবগ্রাম ছাড়া নাছিয়া গ্রামের বাসিন্দারাও জানালেন, গ্রামের সরকারি নলকূপে দীর্ঘদিন আগে ভূগর্ভস্থ জলে মাত্রা তিরিক্ত ফ্লোরাইড ধরা পড়লেও এখনও পরিশ্রূত পানীয় জলের ব্যবস্থা সরকার থেকে করে দেওয়া হয়নি। অথচ সরকার থেকে দুটি নলকূপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়ার জন্য গ্রামের মানুষ এখনও নদীর জলের উপর নির্ভর করে সেই জল পানীয় হিসাবে যেমন ব্যবহার করে। বর্ষাকালে নদীর জল বেড়ে গেলে গ্রামের যে সরকারি নলকূপে ফ্লোরাইড কম সেখানকার জলও পান করে। এদিকে নদীর ভাঙনের কি অবস্থা বা ভাঙন রোধে দফতরের অন্যান্য কর্মীরা কি ব্যবস্থা নিয়েছে সে ব্যপারে খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সেচ দফতরের ময়ূরাক্ষী উত্তর ক্যানেলের রামপুরহাট বিভাগের নির্বাহী আধিকারিক তরুণ রায় চৌধুরী। রামপুরহাট ১ ব্লকের বিডিও নীতিষ বালা বলেন, ‘‘পঞ্চায়েতের মাধ্যমে নদী ভাঙন প্রতিরোধে ১০০ দিন প্রকল্পে কাজ করানো যেতে পারে।’’
এলাকার তিন বারের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘নাছিয়া, দেবগ্রাম এলাকায় নদী ভাঙন নিয়ে সেচ মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। জেলাতে সেচ দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ বিষয়টি জন স্বাস্থ্য কারিগরী বিভাগ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’’