পঞ্চায়েত দখলকে কেন্দ্র করে এ বার তৃণমূলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দেখা গেল মুরারইয়ে। একই সঙ্গে কংগ্রেস পরিচালিত মুরারই পঞ্চায়েতের প্রধানকে সরাতে চেয়ে কংগ্রেস, তণমূল সদস্যরা সিপিএম ও ফরওয়ার্ড ব্লক সদস্যদের সঙ্গে হাতও মেলালেন। প্রধানের প্রতি অনাস্থা আনা ১৪ জন সদস্যের সাক্ষরিত আবেদনপত্র বৃহস্পতিবার মুরারই ১-এর বিডিও ও সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েতের জমা পড়ে। পঞ্চায়েত সূত্রে জানা যায়, যে ১৪ জন সদস্য প্রধানের অপসারণ চেয়ে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন তাঁদের মধ্যে সিপিএমের ৫ জন, ফব ২, তৃণমূলের ৪ এবং কংগ্রেসের ৩ জন সদস্য আছেন।
পঞ্চায়েত নির্বাচনের ২৪ সদস্যের মুরারই পঞ্চায়েতে দলগত অবস্থান ছিল কংগ্রেস ৯, তৃণমূল ৬, সিপিএম৬ , ফব ২ এবং নির্দল সদস্য ১। তৃণমূলকে প্রতিহত করে কংগ্রেস নেতৃত্ব নির্দলের সমর্থন নিয়ে বোর্ড গঠন করে। প্রধান হন কংগ্রেসের সুদীপকুমার মেহেনা। মুরারই মূলত কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল। ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস ও তৃণমূল জোটে তৃণমূল প্রার্থী নুরে আলম চৌধুরী জয়ী হন। এর পরে ব্লক নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন মহুরাপুর পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান বিনয় ঘোষ। তৃণমূলের জেলা নেতৃত্ব বিনয় ঘোষকে মুরারই ১ ব্লক সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ দিকে নুরে আলম চৌধুরী তখন তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদে থাকা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীতে ছিলেন। সেই কারণে মুরারই এলাকা এখনও মন্ত্রী গোষ্ঠী বলে পরিচিত।
আবার মুরারই থানার কলহপুর গ্রামে মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহর বাড়ি হওয়ার জন্য তৃণমূলের জেলা নেতৃত্ব চন্দ্রনাথ সিংহকে মুরারই এলাকার সংগঠন দেখভাল করার দায়িত্ব দেন। এ দিকে নলহাটি বিধানসভার উপনির্বাচনে মুরারই ১ ব্লক কংগ্রেস সভাপতি আব্দুর রহমান লিটন কংগ্রেসের প্রার্থী হন। অন্য দিকে তৃণমূলও আলাদা করে বিপ্লব ওঝাকে প্রার্থী করেন। দু’জনেই বামফ্রন্ট প্রার্থী দীপক চট্টোপাধ্যায়ের কাছে হেরে যান। ইতিমধ্যে পঞ্চায়েত ভোটের আগে মুরারই ১ পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি প্রদীপ ভকত কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। প্রথমে বিনয় ঘোষ এবং পরে প্রদীপ ভকত তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় মুরারই ১ পঞ্চায়েত সমিতির মহুরাপুর, রাজগ্রাম, গোঁড়শা, চাতরা এই চারটি পঞ্চায়েত এলাকায় তৃণমূল তাদের সংগঠন বাড়াতে সক্ষম হয়। পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূল রাজগ্রাম পঞ্চায়েত একক ভাবে দখল করে এবং প্রদীপ ভকত জেলাপরিষদে তৃণমূল প্রার্থী হয়ে জয়ী হন।
এখানেই শেষ নয়। পঞ্চায়েত ভোটের মুরারই ১ ব্লক সভাপতি পদ থেকে আব্দুর রহমান লিটনকে সরিয়ে দেওয়ায় তাঁর নেতৃত্বে ওই পঞ্চায়েত সমিতির সমস্ত কংগ্রেস সদস্য এবং এলাকার ৭টি পঞ্চায়েতের অধিকাংশ সদস্য, কংগ্রেস কর্মী-সমর্থক তৃণমূলে যোগ দেন। এর পর থেকেই তৃণমূলে আব্দুরের প্রভাব বাড়াতে থাকে। কিন্তু মুরারই এলাকার পুরনো তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগ, কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যে সমস্ত পঞ্চায়েত সদস্য যোগ দেন তাঁরা দলের নিয়ম মেনে আসেননি। সে জন্য দলের অন্দর মহলে নব্য তৃণমূল এবং পুরনো তৃণমূলের বিভেদ সৃষ্টি হয়। তার ফল মুরারই পঞ্চায়েতে অনাস্থা। তৃণমূলের মুরারই ১ ব্লক সভাপতি বিনয় ঘোষ অবশ্য দাবি করেন, “মুরারইয়ে কোনও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেই। পঞ্চায়েত সদস্যরা প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ করে অনাস্থা এনেছেন। পঞ্চায়েত সদস্যদের ব্যক্তিগত মতামত নেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের মতামত জেলা সভাপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। অনাস্থার সভা ডাকার এখনও সময় আছে। দলের জেলা সভাপতি আগামী রবিবার পাইকরে আসছেন। সেখানে আলোচনা করে অনাস্থা যাতে ঠেকানো যায় সেই চেষ্টা করা হবে।”
অন্য দিকে, অনাস্থায় ৫ সিপিএম সদস্য, ২ ফব সদস্য, ৩ কংগ্রেস সদস্যের হাত মেলানোর ব্যাপারে তৃণমূলের এক সদস্য এনামুল হক বলেন, “এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই। যা জানার দলের ব্লক সভাপতির কাছে জেনে নেন।” সিপিএম সদস্য আব্দুল আজিদ বলেন, “আমরা একটা আলাদা দল করে প্রধানের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেছি। এখানে তৃণমূল সদস্যরা আমাদের সঙ্গে আছেন।” আর ফব সদস্য মকিবুল মণ্ডল বলেন, “তৃণমূলের সঙ্গে থাকতে যাব কেন? বেশিরভাগ সদস্য প্রধানের কাজকর্মে অখুশি হয়ে অনাস্থা এনেছে তাই আমাদের দলের দু’জন সদস্য অনাস্থায় সই করেছি।” প্রধানের অদূরদর্শিতা ও ককর্মণ্যতার জন্য অনাস্থা আনা হয়েছে বলে দাবি কংগ্রেস সদস্য দুলাল বিনের। যদিও পঞ্চায়েত প্রধান সুদীপ মেহেনা বলেন, “কী অভিযোগে অনাস্থা এনেছে জানি না। দল বিষয়টা দেখছে। এর বেশি কিছু আমি বলব না।”