কাশীপুর-আদ্রায় সড়কে বেকো সেতুর গায়ে আগাছা ও ফাটল। ছবি: প্রদীপ মাহাতো।
ইতিহাসের গায়ে জন্মেছে আগাছা। শতাব্দী প্রাচীন সেতুর স্তম্ভের গায়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় ফাটল। সেই ফাটল থেকে কোথাও মাথা তুলেছে বট কোথাও অশ্বত্থ। কাশীপুর-আদ্রা রাস্তার উপরে মানভূমের অন্যতম প্রাচীন এই সেতুটির এমন হাল দেখে অবিলম্বে সেটির সংস্কারের দাবি তুলেছেন পুরুলিয়ার মানুষজন। সেতুটিকে হেরিটেজ সেতুর মযার্দা দেওয়ারও দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
পঞ্চকোট রাজবংশের রাজধানী কাশীপুরের সঙ্গে লাগোয়া রেলশহর আদ্রার যোগাযোগ গড়ে তুলতে বেকো নদীর উপর এই সেতুটি গড়ে তুলেছিলেন পঞ্চকোটের মহারাজা জ্যোতিপ্রসাদ সিংহ দেও। জেলার ইতিহাস গবেষক দিলীপ কুমার গোস্বামীর জানান, ১৯০৪ সালে গড়ে উঠেছিল আদ্রা রেলশহর। এই এলাকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন ছিল বেঙ্গল-নাগপুর রেলওয়ের অধীনে। শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের উপনিবেশ ছিল রেলশহরটিতে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে পঞ্চকোটের রাজা ছিলেন মহারাজা জ্যোতিপ্রসাদ। সেই সময় বিহার-ওড়িশার ছোট লাট সস্ত্রীক পঞ্চকোটের সদর কাশীপুরে এসেছিলেন. রাজার আমন্ত্রণ স্বীকার করে। দিলীপবাবু জানান, ছোট লাটের আগমন উপলক্ষেই মহারাজা এই সেতুটি তৈরি করিয়েছিলেন। ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তখনকার ডেপুটি কমিশনারের স্ত্রী মিসেস কুপল্যান্ড। ছোটলাট চার্লস বেইলি ও লেডি বেইলি ১৯১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি সেতুটি উদ্বোধন করেন। স্থানীয় ঐতিহাসিকদের দাবি, এই সেতুটিই সম্ভবত মানভূমের প্রথম সেতু। পুরুলিয়া ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সেই সময়ের বাস্তুকার নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এই সেতু নির্মাণের স্থপতি ছিলেন। তাঁরা জানান, ব্রিটিশ আমলে স্থপতি হিসাবে নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের যথেষ্ট নামডাক ছিল। মানভূম গেজেটিয়ারের (১৯১১) রচয়িতা তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার কুপল্যান্ড তাঁর গেজেটে স্থপতি হিসাবে নন্দলাল বাবুর দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে দরবার হয়েছিল। ইংল্যান্ড থেকে রাজা পঞ্চম জর্জ সেই দরবারে এসেছিলেন। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের রাজা-মহারাজাদের। মানভূম থেকে দরবারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন মহারাজা জ্যোতিপ্রসাদ। ১৯১১ সালের দরবারে ঘোষণা করা হয় সুবা বাংলাকে নতুন করে ভাগ করার কথা। সেই মোতাবেক একটি ভাগের নাম হয় বাংলা। তার রাজধানী ছিল কলকাতা। অন্য ভাগটির নাম হয় বিহার-ওড়িশা। তার রাজধানী ছিল পাটনা। মানভূম জেলা ছিল বিহার-ওড়িশা প্রদেশের অধীনে। তবে ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল ওড়িশা আলাদা রাজ্যের মর্যাদা পায়। সেই রাজ্যেরই গভর্নর চার্লস বেইলি এসেছিলেন পঞ্চকোটে। সেই উপলক্ষে বেকো নদীর উপর বর্তমান সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম জর্জের সম্মানে সেতুটি উৎসর্গ করা হয়েছিল। দিলীপবাবুর কথায়, মানভূমের অন্য তিনটি প্রধান সেতু হল কংসাবতী নদীর উপর পুরুলিয়া-টাটানগর সড়কের একটি সেতু, ওই নদীরই উপর পুরুলিয়া-রাঁচি সড়কে তুলিনের কাছে একটি সেতু এবং পুরুলিয়া-ধানবাদ সড়কে দামোদর নদের উপরে তেলমচ সেতু। তাঁর দাবি, এই তিনটি সেতুই বেকো নদীর সেতুটির পরে তৈরি হয়েছে। আদ্রা রেল শহরের বাসিন্দা তথা গবেষক শ্রমিক সেনও জানান, এই সেতুটি মানভূমের অন্যতম প্রাচীন সেতু।
বয়স একশো পেরিয়ে গেলেও সেতুটি অক্ষত রয়েছে। তবে সংস্কারের অভাবে সেতুটির থামে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটল চিরে গাছ গজিয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা বিদ্যাধর মাহাতোর জানান, প্রতিদিন সেতুর উপর দিয়ে অনেক যান চলাচল করে। যথাযথ সংস্কার না হলে সেতুটি ভেঙে পড়তে পারে। সেই জায়গায় নতুন সেতু গড়ে তোলা যেতেই পারে কিন্তু তার ফলে ইতিহাসের এমন চিহ্ন হারিয়ে যাবে। দিলীপবাবুও জানান, সেতুটির হেরিটেজ মযার্দা পাওয়া দরকার।
কাশীপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সৌমেন বেলথরিয়া জানিয়েছেন, সেতুটি সংস্কারের জন্য পূর্ত দফতর ও প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হবে। পূর্ত দফতরের নির্বাহী বাস্তুকার তরুণকুমার চক্রবর্তীর দাবি, সেতুটির বিষয়ে তাঁদের দফতরে অভিযোগ বা আবেদন জমা পড়েনি। তবে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেতু পরিদর্শনে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।