—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
আর জি কর আন্দোলনের সময়েই জোরদার দাবি উঠেছিল, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পুরোপুরি দুর্নীতি ও প্রভাবশালী মুক্ত করার। আন্দোলনের আগুন প্রশমিত করতে তখনকার মতো কিছু বিষয়ে পদক্ষেপও করে রাজ্য সরকার। কিন্তু আর জি করের ঘটনার প্রায় দেড় বছর পরেও রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আদৌ পুরোপুরি দুর্নীতি এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রভাব মুক্ত হতে পেরেছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে।
বিরোধী সংগঠনের চিকিৎসকেরা তো বটেই, সরকারপন্থীদেরও একাংশের দাবি, আর জি কর আন্দোলনের পরেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিশেষ ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রভাব বা হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়নি। বরং বিষয়টি আরও সন্তর্পণে করা হচ্ছে। সম্প্রতি যার প্রমাণ বার বার মিললেও কোনও হেলদেল নেই রাজ্য প্রশাসনের দিক থেকে। পদোন্নতির ইন্টারভিউতে হেল্থ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের বিভিন্ন অনৈতিক পদক্ষেপ, এমবিবিএস পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রতিহিংসা মূলক আচরণ, ওষুধের গুণগত মান খারাপ, ভাড়া নিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের দাদাগিরি, হাসপাতালে শয্যা পাওয়া নিয়ে সক্রিয় দালাল চক্র, ডিউটির সময়ে এক শ্রেণির চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস—সবই বহাল তবিয়তে চলছে বলেই অভিযোগ খোদ চিকিৎসক মহলেরই বড় অংশের।
তাঁদের দাবি, ঝাঁ চকচকে ভবন বানানো, হাসপাতালের শয্যা এবং নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করে এমবিবিএসের আসন বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসাথী, স্বাস্থ্য-বন্ধু, শিশুসাথী, চোখের আলো-সহ বিভিন্ন প্রকল্পে কত মানুষ পরিষেবা পেয়েছেন, এবং বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে কত টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি হল, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সেই পরিসংখ্যান হয়তো প্রচারে আনবে শাসকদল। কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত বা নীচের স্তরে এখনও যে ফাঁক থেকে গিয়েছে, সে দিকে নজর দেবে কে?
সরকারপন্থী ও বিরোধী শিবিরের চিকিৎসকদের অনেকে এটাও অভিযোগ করছেন, আর জি কর আন্দোলনের সময়ে চিকিৎসকদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে তাঁদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তার পরে আর তেমন কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সুবিধা-অসুবিধা জানতে বৈঠক করেননি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীও। রাজ্যের বেশ কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র চিকিৎসকেরা বলছেন, ‘‘অভাব অভিযোগের কথা বলব কাকে? স্বাস্থ্যভবনে কোনও কিছু জানিয়েই তেমন কোনও ফল হয় না। তাই জানানোও ছেড়ে দিয়েছি।’’
সম্প্রতি ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষের বাজেট বিবৃতিতে সরকার জানিয়েছে, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে মোট ১.০৪ কোটি উপভোক্তা পরিষেবা পেয়েছেন। যার জন্য ১৩,৭৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সরকারের পরিসংখ্যানের সঙ্গে সহমত হলেও সরকারি চিকিৎসকদের একাংশই অবশ্য এ বিষয়ে অভিযোগও তুলছেন। তাঁদের দাবি, এক শ্রেণির চিকিৎসক অসাধু ভাবে বেশি রোজগারের জন্য স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পকে ব্যবহার করছেন। যে অস্ত্রোপচার পরে করা যায় (কোল্ড ওটি), সেই সব রোগীকে সরকারি হাসপাতাল সম্পর্কে বিভিন্ন ‘ভয়’ দেখিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন নার্সিংহোমে। সেখানে ওই চিকিৎসকই স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে অস্ত্রোপচারটি করছেন।
যদিও এ বিষয়ে স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তার দাবি, ‘‘এমন কিছু বিষয় নজরে আসার পরে বেশ কয়েকটি কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছে। বেনিয়ম ধরতে কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও করা হচ্ছে।’’ কিন্তু বেনিয়ম যে একেবারে বন্ধ করা যায়নি, সেটাও মানছে স্বাস্থ্যভবন।
আবার, মা ও শিশুদের জন্য সরকারের অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা থাকলেও, অন্য রোগীদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে বেসরকারি অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের ‘দাদাগিরি’ নিয়ে। রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালের অনিয়মে ব্যবস্থা নিতে রয়েছে স্বাস্থ্য কমিশন। অভিযোগ, কিন্তু কার্যত বাধ্য হয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের চড়া ভাড়া গুণতে গিয়ে রোগীর পরিজনদের যে পকেট ফাঁকা হচ্ছে, তা আটকাতে কোনও ব্যবস্থা আজও সরকার করে উঠতে পারেনি। অ্যাম্বুল্যান্সের দাদাগিরি নিয়ে স্বাস্থ্য-কর্তাদের দাবি, রোগীর পরিজনদের হয়রানি বন্ধ করতে পরিবহণ দফতরের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেটা বাস্তবায়িত করার কথা পরিবহণ দফতরের। আর, দালাল চক্র বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কড়া পদক্ষেপ করতে হবে বলেই দাবি স্বাস্থ্যকর্তাদের।
অভিযোগ রয়েছে সরকারি হাসপাতালের ওষুধের গুণগত মান ও সরবরাহ নিয়েও। খোদ চিকিৎসকেরা বলছেন, ‘‘অনেক সময়েই প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। আর পাওয়া গেলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। অথচ সেই ওষুধ রাজ্যের পরীক্ষাগারে গুণগত মানের পরীক্ষায় ভাল ভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে!’’ আবার অনেক জেলাতেই ভ্যাকসিনের কোল্ড স্টোরেজ ঠিকঠাক রাখার জন্য স্বয়ংক্রিয় গ্রিন জেনারেটর থাকার কথা থাকলেও, আদতে তা নেই বলেই অভিযোগ। দিনের পর দিন এমনই ছোট ছোট বিভিন্ন খামতি নিয়েই রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চলছে, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট লোকজনেরই। যদিও এক স্বাস্থ্যকর্তার দাবি, ‘‘নীচের স্তরে কিছু জায়গায় ফাঁক রয়েছে ঠিকই। সেগুলি সবই নজরে রয়েছে। কিন্তু পরিকাঠামো উন্নয়নে খামতি রাখা হচ্ছে না।’’
তবে, সরকারপন্থী ও বিরোধী শিবিরের বহু চিকিৎসকই এখনও ক্ষুব্ধ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে হেল্থ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড নিয়ে। তাঁদের দাবি, আর জি কর আন্দোলনের সময়েই জোরদার দাবি উঠেছিল, ওই দুটি ক্ষেত্রকেই প্রভাবশালী মুক্ত করতে হবে। কারণ, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘ দিন ধরেই বদলি, পদোন্নতি থেকে সব কিছুই হয় ওই প্রভাবশালীদের অঙ্গুলি হেলনে। এমনকি, আর জি কর কাণ্ডে শাসকদলের ওই প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠদের কয়েক জনের বিরুদ্ধে অভিযোগও উঠেছিল। আর জি কর আন্দোলনের আবহে এক রাতেই স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা, স্বাস্থ্য অধিকর্তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তার পরে দুর্নীতি বা অনিয়ম রুখতে আর কোনও পদক্ষেপ সরকার করেনি বলেই অভিযোগ চিকিৎসক মহলের। তাঁদের কথায়, ‘‘তাই এখনও পদোন্নতির ইন্টারভিউতে সিনিয়র চিকিৎসককে নিয়ে গিয়ে স্রেফ বসিয়ে রাখার মতো ঘটনাও শোনা যায়। স্বজনপোষণও বহাল তবিয়তে চলছে।’’
যদিও রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, কোনও গোষ্ঠী স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছেন— এমন অভিযোগ অমূলক। তবে এটাও ঠিক যে, এক শ্রেণির চিকিৎসকের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, ‘‘নিয়োগ বা পদোন্নতিতে স্বজনপোষণের অভিযোগ ঠিক নয়। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে জিডিএমও পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনলাইনে কম্পিউটারের সামনে বসে দিতে হয়েছে।’’
ভোটের মুখে স্বাস্থ্যে একাধিক উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরছে সরকার। কিন্তু অসংখ্য ছোট-ছোট কারণে সরকারি চিকিৎসকদের বড় অংশের মধ্যে ছাই চাপা আগুনের মতো ক্ষোভ ক্রমশ পুঞ্জীভূত হওয়ার আঁচ কি আদৌ পাচ্ছে উপরের তলা? শুধু পরিকাঠামোর উন্নয়ন বা বিভিন্ন প্রকল্প চালু করে কি সেই আগুন নেভানো সম্ভব হবে?
(শেষ)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে