ব্যস্ত রাজপথ। সাঁ সাঁ করে ছুটছে বিদেশি গাড়ি। চালকের আসনে বছর আঠারো-র যুবা। লাগামছাড়া গতি, অনিয়ন্ত্রিত মরণ-বাঁক। ট্র্যাফিক পুলিশ গাড়ি থামাতেই, রাস্তায় নেমে আসে ঝকঝকে চেহারা। ধোপদুরস্ত জামাকাপড়, চোস্ত বুলি। সেই বুলিতে মিশে থাকা গালাগালির সঙ্গে উর্দি পরা পুলিশকে খোলা আকাশের নীচে সপাটে চড়!
সারা শহরের চোখের সামনে নিত্য ঘটে চলেছে এই অভব্যতার চলচ্চিত্র। এক শ্রেণির তরুণ তুর্কি যেন প্রতিনিয়ত গলা চড়িয়ে ঘোষণা করছে, ‘‘আমরা বেয়াদব, আমরা বেপরোয়া। আমরা যা খুশি তাই করব। আমাদের গায়ে আঁচড়টুকুও পড়বে না।’’ প্রশ্ন ওঠে, এই আত্মবিশ্বাসের উৎস কী?
উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ঘটনার ভিতরেই। প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই বেয়াদবির সঙ্গে সেঁটে রয়েছে প্রভাবশালীর বর্ম। নিজের নয়, পরিবারের সদস্যের। হয় রাজনৈতিক শিবির, নয় রুপোলি পর্দার জগৎ, নয়তো বা অর্থের জোরে সামাজিক প্রতিপত্তি। যে কোনও কিছুর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে এই তরুণদের বাবা-কাকা-মামা-পিসিরা। আর সেই ‘ভরসা’তেই ঔদ্ধত্যের তুঙ্গে উঠেছে তারুণ্য।
রবিবারই মুখ্যমন্ত্রী-ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী টলিউড প্রযোজকের ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, অডি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে অন্য গাড়িতে ডিম ছুড়ে মারার এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্য গাড়িকে ধাক্কা মারার। ঘটনায় অভিযোগ পর্যন্ত দায়ের হয়নি। স্থানীয় মানুষ দাঁড় করিয়ে মারধর করেন প্রযোজকের ওই ছেলে ও তার বন্ধুকে। বিষয়টি থানা পর্যন্ত গড়ালেও কোনও অভিযোগ হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, দু’পক্ষের আপসে মিটে গিয়েছে বিষয়টি। গত সেপ্টেম্বরেই ওই প্রযোজক-পুত্রের গাড়ির ধাক্কায় রেড রোডে একটি ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছিল। তখনও ওই নাবালককে গ্রেফতার না-করায় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল পুলিশ। তবে এ তো নতুন নয়! সেই বাম আমলে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল পুলিশকে মারধর করার। তার পর শাসক দলের রং বদলালেও চেহারা বদলায়নি প্রভাবশালীর বর্ম-আঁটা বেয়াদবির। ২০১২-র মার্চে কর্তব্যরত ট্র্যাফিক পুলিশকে ধাক্কাধাক্কি ও কাজে বাধা দেওয়ায় অভিযুক্ত হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো আকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৫-র মে মাসে, রাসবিহারী মোড়ে ট্র্যাফিক আইন ভাঙার পর পুলিশকে নিগ্রহ করার অভিযোগ ওঠে মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ভাইঝি দেবপ্রিয়ার বিরুদ্ধে। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।
গত বছর জানুয়ারিতে এ ভাবেই শাসক দলের এক নেতার ছেলের বেপরোয়া অডির তলায় চাপা পড়ে এক সেনা-জওয়ান মারা যাওয়ার পরে অভিযুক্তদের ধরতে কালঘাম ছোটে পুলিশের।
এই উদ্দামতার সাম্প্রতিকতম উদাহরণটি আঠারো বছরের ছাত্র আবেশ দাশগুপ্তের মৃত্যুতে দেখেছিল শহর। গত বছরের জুলাইয়ে বান্ধবীর বাড়ির জন্মদিনের পার্টিতে আবেশের মৃত্যুতে অজস্র রহস্যের পরত ছিল। সেই রহস্যের জট আজও খুলতে পারেনি পুলিশ। রবিবারের দুর্ঘটনায় নাম জড়ানো প্রযোজক-পুত্র এই অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিল। যে প্রধান অভিযুক্ত, তার বাবাও ‘প্রভাবশালী’।
সমাজতত্ত্ববিদ অভিজিৎ মিত্রের কথায়, ‘‘আমরা যেটা ঔদ্ধত্য ভাবি, সেটা আসলে অবক্ষয়, বিচ্ছিন্নতা। এই বয়সি ছেলেমেয়েরা যে বহু ভাল কাজও করছে, সেগুলো বেশি করে সামনে আনা দরকার।’’
সমাজতত্ত্ববিদ প্রশান্ত রায়ের মতে, এই ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন ধরেই ছোট অন্যায় করে আসছে হয়তো। আর প্রতি বারই পরিবারের তরফে শাসনের বদলে প্রশ্রয় পেয়েছে। শিখে এসেছে, যে কোনও অন্যায় কয়েকটা ফোনের মাধ্যমে ‘ঢেকে’ দেওয়া যেতে পারে। এক পুলিশকর্তার সাফ বক্তব্য, ‘‘কোনও অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ারই নির্দেশ রয়েছে আমাদের।’’ কিন্তু বাস্তব তো বলছে অন্য কথা। বলছে, বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীর সন্তানরা। ওই পুলিশকর্তার ব্যাখ্যা, পরিস্থিতির চাপে হয়তো ব্যতিক্রম ঘটে কখনও কখনও।