উত্তরাখণ্ডের পথে সম্রাট মৌলিক। ছবি: সংগৃহীত।
কয়েক মাস আগের এক বিকেল। বাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার নীচে নেমেছিলেন উত্তরাখণ্ডের পৌরী গাড়ওয়ালের ডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা চৈতী দেবী। পাশেই স্কুল। সেখানেই তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মানুষখেকো চিতা। কোনও রকমে বাঁচলেও এখনও চিকিৎসা চলছে চৈতীর। ক্ষতিপূরণ মিলেছে মাত্র ১১ হাজার টাকা। পুরো সুস্থ হতে চিকিৎসার খরচ পাবেন কোথা থেকে, জানা নেই। নৈনি পন্ডার গ্রামের এক মহিলার উপরে একই দিনে বার তিনেক হামলা চালিয়েছিল চিতা। বরাতজোরে মহিলা রক্ষা পেয়েছেন প্রতি বারই। শৌচাগারে যেতে গিয়ে ভাল্লুকের আক্রমণে প্রায় মরতে বসেছিলেন চৌমাসীর শঙ্করী দেবী। বন দফতর রিপোর্ট নিয়ে গেলেও আজও মেলেনি সরকারি সাহায্য। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে, উত্তরাখণ্ডের বহু গ্রাম এখন কাঁপছে মানুষখেকো বাঘ ও ভাল্লুকের আতঙ্কে।
কিন্তু কেন? কেন আচমকা মানুষ ও বন্যপ্রাণের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সমীকরণটা বদলে গিয়েছে উত্তরাখণ্ডে? পাহাড়ি ওই রাজ্যে জলবায়ুর পরিবর্তনের জেরেই কি এই পরিবর্তন? তা জানতেই উত্তরাখণ্ডের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ালেন ভূপর্যটক ও নদীপ্রেমী সম্রাট মৌলিক। গত ৮ মার্চ বাঘা যতীনের বাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। অভিযানের প্রথম পর্বে গৌরীকুণ্ড থেকে গুপ্তকাশী, রুদ্রপ্রয়াগ ছুঁয়ে ১৮ দিনে ১৪২ কিলোমিটার পথ একা হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন। দ্বিতীয় পর্বে পৌরী গাড়ওয়ালে ২৮ কিলোমিটার গিয়েছেন কখনও হেঁটে, কখনও গাড়িতে। ২৩ দিনে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে অভিযানের শেষে সদ্য শহরে ফিরেছেন তিনি।
লাদাখ থেকে কন্যাকুমারীর পথে একশোরও বেশি নদীকে ছুঁয়ে এসেছেন সম্রাট। গঙ্গা অববাহিকা থেকে রাশিয়ার ভল্গা বা উজবেকিস্তানের আমুদরিয়া নদী— নদীপ্রেমিক সম্রাটের পা পড়েছে প্রায় সর্বত্র। তবে এ বার শুধুই নদী নয়, নদীতীরের মানুষ ও বন্যপ্রাণকে জানতে চেয়েছেন। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তন কী ভাবে বদলে দিচ্ছে পাহাড়ি নদী ও পাহাড়ি মানুষদের জীবন, এই অভিযানে সেটাই কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন সম্রাট। তিনি বলছেন, ‘‘অলোকানন্দা, গঙ্গা আর মন্দাকিনী উত্তরাখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ নদী। কিন্তু গত অক্টোবরের পরে এখানে বৃষ্টি হয়নি, তেমন বরফও পড়েনি। ফলে নদীগুলি পুষ্ট হয়নি। ঠান্ডা জাঁকিয়ে না পড়ায় শীতঘুমে যায়নি হিমালয়ান ভাল্লুকও। ফলে চামেলি, রুদ্রপ্রয়াগের মতো জায়গায় বাঘ-ভাল্লুকের আচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তারা ক্রমশ মানুষখেকো হয়ে উঠছে।’’
দাবানল, বাসস্থান হারানো, জঙ্গল কেটে জল প্রকল্প তৈরি-সহ নানা কারণে ক্রমশ গ্রামের ভিতরে চলে আসছে বন্যপ্রাণীরা। রাস্তা চওড়া করা, হড়পা বান পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। ফলে ‘সহজ শিকার’ মানুষকেই নিশানা করছে বাঘ-ভাল্লুকেরা। তাই স্থানীয় ভাষায় ‘গোলদার’-এর দেখা পাওয়া এখন আর কঠিন ব্যাপার নয়। যদিও ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানে সম্রাটের সেই ‘সৌভাগ্য’ হয়নি। তবে, দেখা পেয়েছেন হাতে গোনা কয়েক জনের, যাঁরা মানুষখেকোদের থাবা এড়িয়ে কোনও মতে বাঁচতে পেরেছেন। কখনও একাকী পৌঁছে গিয়েছেন সেই সব নির্জন জায়গায়, যেখানে কিছু দিন আগেই দিনেদুপুরে হামলা চালিয়েছে ‘গোলদার’।
রুদ্রপ্রয়াগে মানুষখেকো বাঘের উপদ্রবে অতিষ্ঠ মানুষকে বাঁচাতে ১৯২৬ সালে ত্রাতা হয়ে এসেছিলেন জিম করবেট। ঠিক একশো বছর পরে ফের মানুষখেকোর ভয়ে কাঁপছে উত্তরাখণ্ড। তবে এ বার মাত্র একটি নয়, মানুষখেকোর সংখ্যা অসংখ্য! বন দফতর শিকারী দিলেও তাই আতঙ্ক কাটছে না। এই অভিযানে প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরে সম্রাট কথা বলেছেন স্থানীয়দের সঙ্গে। তাঁরাও সস্নেহে আপন করে নিয়েছেন বাঙালি ভূপর্যটককে।
সম্রাট জানাচ্ছেন, ত্রিযুগীনারায়ণে এক রাতে সাতটি গরু-মোষকে মেরেছে ভাল্লুক। গৌরীকুণ্ডের রামপুরে ভরদুপুরে ভাল্লুকের হামলা হয় স্থানীয় মঙ্গল সিংহের উপরে। ডাঙ্গি গ্রামে গত কয়েক মাস ধরে বিকেল হলেই পথেঘাটে দেখা মেলে চিতার। জঙ্গলে ঘাস-পাতা সংগ্রহ করতে যান গ্রামের মহিলারা, ফলে তাঁদের উপরেই হামলা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ডেঙ্গি গ্রামের এক মহিলা সভয়ে সম্রাটকে বলেন, ‘‘আমার মেয়ে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে পড়ে। কিন্তু চাইলেও খেলতে যেতে পারে না। কারণ, যে কোনও সময়ে ওকে বাঘে তুলে নিয়ে যেতে পারে!’’
এই পরিস্থিতিতে জমছে ক্ষোভ, ভয়ে গ্রামছাড়া হচ্ছেন অনেকে। সম্রাট বলছেন, ‘‘আসলে স্থানীয় লোকগুলি জীবন-মরণের মাঝে প্রতিদিন ঝুলে আছেন। অথচ সরকারের কোনও হেলদোল নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঘ-ভাল্লুককে এক জায়গা থেকে তুলে অন্যত্র ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের ক্ষোভ, বাঘ-ভাল্লুকে মানুষ মারলে সমস্যা নেই, কিন্তু ওদের মারলে জেল হয়ে যাবে!’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে