রবিবার নন্দীগ্রামের সেবাশ্রয় শিবিরে দীপিকা মাইতি (পরনে সবুজ শাড়ি) এবং তাঁর পাশে সন্তান কোলে রোজিনা বিবি। — নিজস্ব চিত্র।
রবিবার সূর্য তখন মধ্যগগনে। চণ্ডীপুর বিধানসভার সীমানা পার করে নন্দীগ্রামের সীমানায় ঢুকতেই থমকে গেল গাড়ি। দূর থেকে কেউ একটা আসছেন। মিনিট খানেকেরও কম সময়ে নন্দীগ্রামের দিক থেকে এগিয়ে এল লম্বা কনভয়। যে কনভয়ের একটি গাড়িতে রয়েছেন বিরোধী দলনেতা তথা এই নন্দীগ্রামেরই বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। যে নন্দীগ্রামে পাঁচ বছর আগের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি পরাজিত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যপাধ্যায়কে। যে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুকে ‘বেগ’ দিতে স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির ‘সেবাশ্রয়’ শুরু করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত ১৫ জানুয়ারি নন্দীগ্রামে শুরু হয়েছিল সেবাশ্রয়। ১০ দিনে দু’টি ব্লকের শিবিরে পরিষেবা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ৩৫ হাজারের আশেপাশে। রবিবারও খোদামবাড়ি এবং নন্দীগ্রাম বাইপাস এলাকার সেবাশ্রয় শিবির দু’টিতে চোখে পড়ার মতো ভিড় দেখা গেল। যে ভিড় দেখে উৎসাহী তৃণমূলও।
পরিষেবা নিতে আসা বেশিরভাগ মানুষ নন্দীগ্রামের হলেও আশেপাশের এলাকা থেকেও রোগীরা ভিড় জমাচ্ছেন অভিষেকের ক্যাম্পে। যেমন, চণ্ডীপুর থেকে এসেছিলেন সুদর্শন বিষয়ী। এসেছিলেন চোখ দেখাতে। তিনি কী ভাবে জানলেন? তাঁর কথায়, ‘‘আমার শ্যালিকা নন্দীগ্রামে থাকেন। তিনি এই শিবিরে চিকিৎসা করিয়ে খুব আনন্দিত। আমাকে জানিয়েছিলেন, তাই আজ রবিবার ছুটি পেয়ে এসেছি।’’ হলদিয়া থেকে এসেছিলেন অনিতা ধাড়া। তাঁরও সমস্যা চোখে। তিনি নন্দীগ্রামের সেবাশ্রয়ের খোঁজ পেয়েছেন ফেসবুক থেকে। অনিতা কি কোনও রাজনৈতিক দল করেন? জবাব দিলেন, ‘‘পার্টি করি না। তবে ভাইপোকে (ঘটনাচক্রে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো) বেশ হিরোর মতো লাগে।’’ হিরো? নেতা নয়? অনিতার জবাব, ‘‘অত জানি না। চোখের ড্রপের লাইনে দাঁড়াতে হবে।’’
শুধু চণ্ডীপুর বা হলদিয়া নয়, পটাশপুর থেকে এসেছিলেন দেবাশিস শাসমল। ২০২০ সাল থেকে দু’টি কিডনিই খারাপ। সঙ্গে এসেছিলেন স্ত্রী নমিতা। তিনি জানালেন, তাঁর একটা কিডনি তিনি স্বামীকে দিতে চান। সেটা সম্ভব কি না জানতেই এই শিবিরে এসেছেন।
রবিবার নন্দীগ্রামে সেবাশ্রয় শিবিরে মানুষের ভিড়। — নিজস্ব চিত্র।
১০ দিন আগে যখন নন্দীগ্রামে সেবাশ্রয় শুরু হল, সে দিন রোগীদের থেকেও তৃণমূলের ভিড় বেশি ছিল। কারণ সে দিন অভিষেক এসেছিলেন। তাঁর নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানাবিধ বিধিনিষেধ ছিল। ফলে অনেকেই সে দিন শিবির পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি। তা ছাড়া গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের শিবিরের কথা মুখে মুখে প্রচারিত হয়। গত ১০ দিনে তার প্রচার যে হয়েছে তা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে রবিবারের দু’টি শিবিরে। এমনই পরিস্থিতি হয়েছিল রবিবার, ভিড়ের চাপে নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লকের সেবাশ্রয় শিবিরের মূল ফটক ভেঙে গিয়েছে। তার পর লাইন নিয়ন্ত্রণ করতে তৃণমূলের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি নামতে হয় পুলিশকেও। ১ নম্বর ব্লকের সেবাশ্রয়ের সদর দরজায় বসাতে হয় পুলিশ পিকেট। যাকে ‘শুভ সংকেত’ হিসেবেই দেখছে নন্দীগ্রামের তৃণমূল।
নন্দীগ্রামে সেবাশ্রয় শিবিরে অপেক্ষায় স্বাস্থ্য পরিষেবা নিতে আসা প্রৌঢ়। — নিজস্ব চিত্র।
সেবাশ্রয় শিবিরকে সংগঠিত ভাবে পরিচালনা করতে দুই নেতাকে দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন অভিষেক। ২ নম্বর ব্লকের দায়িত্বে কলকাতা পুরসভার ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ এবং ১ নম্বর ব্লকের দায়িত্বে দলের মুখপাত্র ঋজু দত্ত। সেবাশ্রয় শুরুর দিন দৃশ্যতই এই দুই নেতা ছিলেন বিধ্বস্ত। বিশেষ করে সুশান্তকে দেখে মনে হয়েছিল তাঁর উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছে। ১০ দিনের মাথায় সেই দুই নেতাই পরিপাটি এবং আত্মবিশ্বাসী। কারণ শিবিরে ভিড় জমছে, যেটা চেয়েছিল ক্যামাক স্ট্রিট। চেয়েছিলেন অভিষেক। এই দুই নেতা নিজেদের সর্ম্পকে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে তাঁদের ঘনিষ্ঠেরা বলছেন, রেলগাড়ি লাইনে পড়ে গেছে। এ বার তা চলছে। তবে ঘনিষ্ঠরা এটাও বলছেন, লাইনের মাঝে যাতে ‘বিপদ’ না-এসে পড়ে, সে দিকেও কড়া নজরদারি রাখতে হচ্ছে। ‘বিপদ’ কিসের? ঋজু এবং সুশান্তদের ঘনিষ্ঠদের কথায়, ‘বিপদের’ নাম শুভেন্দু অধিকারী। তাঁদের ভয়টা কোথায়? নন্দীগ্রাম ১ ব্লকের তৃণমূলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘ক্যাম্পে দিনে অন্তত ৪০-৫০ জন আসছেন যাঁরা ডাক্তার দেখানোর নাম করে ঢুকে ভিডিয়ো করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আসলে তাঁদের পাঠানো হচ্ছে। এখানে একটু এদিক ওদিক পেলেই কুৎসা শুরু হবে।’’
এই কথা শেষ হতে না-হতেই ব্লক নেতার সহকারী স্বগতোক্তির ঢঙে বলে ফেললেন, ‘‘হার্ট ফুটো লোকজন এখানে যদি মরে যায়, তা হলে শুভেন্দু সেবাশ্রয়ের দরজায় ধর্নায় বসে পড়বে। তাই আমরা ভয়ে ভয়ে আছি। এটা বিরাট টেনশনের কাজ।’’
নন্দীগ্রামের রাস্তায় সেবাশ্রয়, বাংলার বাড়ি, আমাদের পাড়া আমাদের সমাধানের মতো তৃণমূল তথা রাজ্য সরকারের কর্মসূচিগুলির সঙ্গেই শোভা পাচ্ছে বিজেপির বিভিন্ন ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির প্ল্যাকার্ড, হোর্ডিং। প্রতিযোগিতা চলছে পতাকা, ফেস্টুন লাগানোর। নন্দীগ্রামের আকাশে বাতাসে মেরুকরণ তীব্র। হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণ রয়েছে। অথচ সেবাশ্রয় শিবিরের ছাদের নীচে ডাক্তার দেখানোর জন্য লাইন দিয়েছেন দীপিকা মাইতি এবং রোজিনা বিবি। দীপিকার সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা। রোজিনার মাথায় হিজাব টানা, কোলে বাচ্চা। দু’জনেরই বাড়ি নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকে। রোজিনার জল ফুরিয়ে গিয়েছিল। দীপিকা জোগাড় করে দিলেন। দু’জনের উদ্দেশেই এক প্রশ্ন, আপনাদের এখানে নাকি হিন্দু-মুসলমান দেখে ভোট হয়? দু’জনেই জবাব দিলেন, ‘‘বাইরে কী হয় বলতে পারব না।’’ অর্থাৎ সেবাশ্রয়ের ছাদের তলায় সম্প্রীতির ফ্রেম তৈরি হলেও নন্দীগ্রামের মেরুকরণ যে প্রকট, তা অতীতে দেখা গিয়েছে। তবে সাংগঠনিক ভাবে তৃণমূল মনে করছে, এত দিন নন্দীগ্রামে তাদের সংগঠন ছিল জলের মতো। পা রাখলে গোটা শরীর ডুবে যাচ্ছিল। এখন সেখানে অন্তত বালি পড়েছে। কিন্তু তা চোরাবালি নয় তো? জবাব দেবে নির্বাচনের ফলাফল।