হালের জমজমাট দোমোহনি বাজার। ছবি: দীপঙ্কর ঘটক।
প্রশ্ন: উত্তরবঙ্গের ভূতগুলো সব গেল কোথায়?
উত্তর: কিছু দিন আগে দোমোহনির একজন লোক আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি যে দোমোহনির ডজন ডজন ভূতের কথা লিখেছেন, কই! আমরা তো দেখতে পাই না! আমি বললাম, দেখতে চান নাকি? তিনি ঈষৎ উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, না, না, চাইছি না। তবে থাকলে তো দেখতেও পাওয়া যেত! আমি তাকে আশ্বস্ত করে বলি, গল্পে যে ভূতের কথা লিখেছি তা মজা করার জন্য। সত্যিই তো আর দোমোহনিতে ভূত গিজগিজ করত না।
উত্তরবঙ্গে যা কমেছে তা ভূত নয়, নির্জনতা। সাত-আট বছর বয়সে যখন আমরা মাল জংশন বা দোমোহনিতে ছিলাম, দিনেদুপুরেও গা ছমছম করত। কী নিবিড় জঙ্গল ছিল, আর জনহীনতা ছড়িয়ে থাকত প্রান্তর প্রান্তর জুড়ে। গাছ কেটে, ক্যান্টনমেন্ট বানিয়ে, শহরের বহর বাড়িয়ে যে যাচ্ছেতাই কাণ্ডটি ঘটেছে, তাতে জলদাপাড়াতেই অরণ্য হয়ে পড়ছে বিরলবৃক্ষ। চাঁদমারির আওয়াজে আরণ্যক প্রাণীদের পিলে চমকানোর কথা।
আমাকে অনেকে ভূতের বিশেষজ্ঞ ভাবেন। তা আমি নই। তবে ছেলেবেলা থেকে আমাদের বাড়ির সেকেন্ডহ্যান্ড ডাইনিং টেবিলটির সুবাদে যে মেমসাহেব ভূত প্রায় সাত-আট বছর ধরে তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে, তাকে ভুলি কী করে? মেমসাহেব আর আসে না বটে, তবে তার সাধের টেবিলটি এখনও আমাদের শিলিগুড়ির বাড়িতে বহাল রয়েছে।
যে-শিলিগুড়ি এখন এক ঘিঞ্জি মেট্রোপলিস, চল্লিশের দশকের প্রথম দিকটায় সেই শহরটাই ছমছমে। মাঠঘাট, জঙ্গল এবং বিরলবসতি। আমাদের কাজের লোক ছিল রাখাল। প্রতি রাতে সে ভূত দেখে চেঁচামেচি করত, তারপর ভূত দেখার দুঃখ এবং ভয়ে কাঁদতে বসত।
দোমোহনিতে একবার এক ভদ্রলোক এলেন, রেলের সেফটি ইনস্পেক্টর বা ওরকম কিছু। তাঁর নাম পানুবাবু। আমাদের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করলেন। ভারী হাসিখুশি মানুষ। রাতের ট্রেনেই ফিরে যাচ্ছিলেন। ফার্স্ট ক্লাস কামরায় সেই রাতেই তিনি খুন হয়ে যান। তদন্তের পর পুলিশের অনুমান, তাঁকে ভুল করে খুন করা হয়েছিল।
এই ঘটনার পর দোমোহনিতে রাতবিরেতে অনেকেই পানুবাবুকে দেখেছে। খাকি হাফপ্যান্ট, শার্ট, বুটজুতো আর হ্যাটপরা টিপিকাল পানুবাবু নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।
সিকিম-চিন সীমান্তে যে-বীর জওয়ানের মন্দির আছে, তাঁকে কে না জানে! চিনের সেনারাও তাঁকে পুজো দিয়ে যান। ডাক্তারি শাস্ত্রমতে তিনি জীবিত নন, কিন্তু তিনি এতটাই জীবিত যে ইন্ডিয়ান আর্মি এখনও তাঁর বেতন প্রতিমাসে তাঁর মায়ের কাছে পাঠায়। ‘বাবা’ নামে পরিচিত এই তরুণ জওয়ানটি অবশ্য ভূত নন, ভগবানের কাছাকাছি। এই ‘বাবা’র অস্তিত্ব অস্বীকার করে, এমন কাউকে সেনাবাহিনীতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তিনি ভীষণ ভাবে বর্তমান, তার প্রমাণ এখনও হামেশা পাওয়া যায়।