খরিদ্দারের অপেক্ষায় অশোক। — নিজস্ব চিত্র
এক বছর আগে মুখ্যমন্ত্রীর শিল্প-তালিকায় ঢুকে গিয়েছিল তেলেভাজা! তার অনেক আগেই এ তল্লাটে তেলেভাজার দোকান খুলে ফেলেছিলেন অশোক সাউ। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাঁর দোকানে চপ, বেগুনি, ডালবড়া, পেঁয়াজি— পড়তে পেত না। এত চাহিদা!
আর এখন? অসীমবাবু কার্যত মাছি তাড়ান। শুধু সন্ধ্যায় কিছুটা ভিড় হয়।
আট বছর আগে এ তল্লাটের ব্যাঙ্কগুলো রমরম করত। আর এখন? মাঝেমধ্যে শুধু গরিব মানুষদের সরকারি সুবিধার জন্য ‘জিরো ব্যালান্স অ্যাকাউন্ট’ খোলার ভিড় হয়।
সেই সময় এই গ্রামাঞ্চলে বাড়িভাড়াও বাড়ছিল হু হু করে। একটি ঘরের ভাড়া ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। আর এখন? দু’কামরা, রান্নাঘর, বাথরুম নিয়ে পুরো আলাদা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাড়ি-মালিকদের তিন হাজার টাকার বেশি ভাড়া মিলছে না। তা-ও নেওয়ার লোক নেই।
কে আর ভাড়া নেবে? কারখানাটাই যে হল না!
২০০৬ সালে টাটারা সিঙ্গুরে গাড়ি-কারখানা গড়ার কাজ শুরু করতেই একরাশ আশা নিয়ে নিজেদের সঞ্চয় উজাড় করে ছোট ব্যবসা করতে নেমে পড়েছিলেন অনেকেই। কেউ খুলে ফেলেছিলেন তেলেভাজার দোকান, কেউ চায়ের, কেউ ইস্ত্রির, কেউ ভাতের হোটেল, কেউ পাঁউরুটি-ঘুগনির। কেউ বা ধাবাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে নতুন চেহারা দিয়েছিলেন। এলাকায় যে মানুষের ভিড় বাড়ছিল! সিঙ্গুরের সানাপাড়া থেকে জয়মোল্লা পর্যন্ত দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের দু’ধারে অন্তত ৩০টি অস্থায়ী দোকান তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কারখানা হলে সিঙ্গুরের চেহারাটা যে পাল্টে যাবে, তা শুধু বামেদের কথা ছিল না, একই ধারণা ছিল ওই সব ছোট উদ্যোগপতিরও।
কিন্তু সেই ধারণা বদলে যায় ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর। ‘অনিচ্ছুক’ চাষিদের জমি ফেরানোর দাবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জঙ্গি আন্দোলনের জেরে সে দিন সিঙ্গুর থেকে গুজরাতের সানন্দে ন্যানো কারখানা নিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করে রতন টাটা বলেছিলেন, ‘‘বলেছিলাম মাথায় বন্দুক ঠেকালেও যাব না। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো ট্রিগার টিপে দিলেন!’’
স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল রতন টাটার। স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ওই সব ছোট ব্যবসায়ীরও। কারখানাটা চলে যাওয়ায় প্রাত্যহিক ভিড়টাও মিলিয়ে যায়। বহুদিন পরে এ তল্লাটে ভিড় দেখা গিয়েছিল গত মাসে। বামেদের ‘সিঙ্গুর থেকে শালবনি পদযাত্রা’র সময়। অশোকবাবুর তেলেভাজার দোকানে ভিড় হয়েছিল। তবু তাঁর মুখে হাসি ফোটেনি। অসীম গিরির ভ্যানোতে যাত্রী হয়েছিল। তবু তিনি সে ভাবে খুশি হতে পারলেন কই! তাঁদের মতে, এ তো এক দিনের ব্যতিক্রম। গত সাত বছর ধরে যে কষ্টে দিন চলছে, তাতে তো মলম পড়বে না।
এক বছর আগে নবান্নে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তেলেভাজা-শিল্প নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‘তেলেভাজার দোকান দিয়েও জীবনে অনেক বড় হওয়া যায়।’’ সিঙ্গুর স্টেশন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা অশোক সাউয়ের অনেক বড় হওয়ার তেমন কোনও বাসনা কোনও দিনই ছিল না। চেয়েছিলেন সংসারটা যেন হেসে-খেলে চলে যায়। ২০০৬ সালে টাটারা যখন গাড়ি কারখানা গড়ার কাজ শুরু করল, তখন সরগরম সিঙ্গুরে একের পর এক অস্থায়ী দোকান খুলছে। কারখানার তিনটি গেটের সামনে তো বটেই, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের দু’ধারেও গড়ে উঠেছিল সেই সব দোকান। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খরিদ্দার সামলাতে হিমসিম খেতেন দোকানিরা। চপ-বেগুনির বিক্রি বাড়তে দেখে
স্বপ্ন বোনা শুরু করেছিলেন অশোকবাবুও। তাঁর কথায়, ‘‘ওই দিনগুলোর কথা বারবার মনে পড়ে। কী বিক্রিটাই না হতো! হাজার
টাকা খরচ করলে অন্তত আড়াইশো টাকা লাভ থাকত। আর এখন? লাভের কথা বলতে লজ্জা লাগে। সে দিন কি আর ফিরবে?’’
ব্যবসার অধোগতির কাহিনি শোনাচ্ছিলেন চা-দোকানি মৃত্যুঞ্জয় সিংহও। তাঁর কথায়, “সেই সময় দোকানে ট্রাক-চালকদের ভিড় লেগেই থাকত। ওরা তো টাটাদের কারখানার জন্য প্রচুর মাল আনত। ভিড়ের চাপে সময়মতো খাবার দিতে পারতাম না। তাই টিভিতে সিনেমা চালিয়ে খদ্দেরদের ভুলিয়ে রাখতাম। দোকানের জন্য বড় টিভিই কিনে ফেলেছিলাম। এখন তার থেকে দশ ভাগের এক ভাগ টাকার মালও বিক্রি হয় না। ব্যাঙ্কের কিস্তি ভরতে আমার হাল খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
এলাকার ব্যাঙ্কগুলির একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসায়ীদের ওই ধার শোধের টাকাই। কেননা, নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে ক’জন আর টাকা জমাবেন! ভিড়টাই তো চলে গিয়েছে! ২০০৬ সালের আগে এ তল্লাটে মেরেকেটে দু’তিনটি ব্যাঙ্ক ছিল। টাটারা কারখানা গড়া শুরু করতেই সেই সংখ্যা দ্রুত বেড়ে ৯ হয়। কিন্তু এখন ব্যাঙ্ক চালাতে হিমসিম খাচ্ছেন
কর্তারা। কমছে কর্মীর সংখ্যাও। তেমনই একটি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের কথায়, ‘‘শুধু জিরো ব্যালান্সের অ্যাকাউন্ট খুলে আমাদের পোষায়? হাইওয়ের পাশে এখন ব্যবসা কোথায়? কে মোটা টাকা রাখবে ব্যাঙ্কে! তখন টাটাদের কারখানার সঙ্গেই সহযোগী ছোট ছোট কারখানা হয়েছিল। ইট, বালি, সিমেন্ট আর পাথরওয়ালারা পর্যন্ত মোটা টাকা রাখতেন ব্যাঙ্কে। আর এখন আমাদের নতুন লোক চাওয়ারই মুখ নেই।”
সিঙ্গুর-মামলা সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন হয়ে যাওয়ায় এখনও ‘অনিচ্ছুক’দের জমি ফিরিয়ে দিতে পারেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের জন্য সরকারি বরাদ্দ হয়েছে শুধু দু’হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা এবং দু’টাকা কিলো দরে চাল। তা পেয়েও ‘অনিচ্ছুক’দের হতাশা এবং ক্ষোভ বাড়ছিল। শুক্রবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জমি ফেরানোর দায় কার্যত ঝেড়ে ফেলায় সেই ক্ষোভ-হতাশা আরও বেড়েছে। গোপালনগর ঘোষপাড়ার ‘অনিচ্ছুক’ চাষি তরুণ ভৌমিক তো শনিবার বলেই ফেললেন, ‘‘উনি অতীত সব ভুলে গেলেন? এখন বলছেন ৫০ বছর? টাকা নিয়ে নিলেই তখন ভাল হতো।’’ আর এক ‘অনিচ্ছুকের’ কথায়, ‘‘আমাদের আন্দোলনের ফলেই আজ রাজ্যের ক্ষমতায় তৃণমূল। আমরাও কিন্তু জমি দিয়ে টাকা নেওয়ার লাইনে দাঁড়াতে পারতাম। তা করিনি। আর এখন এ কথা শুনতে হচ্ছে!’’
এখন বা তখন— মমতা কখনওই তাঁদের কথা ভাবেননি বলে ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ আরও তীব্র। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের দু’ধার এবং কারখানার সামনের অস্থায়ী দোকানগুলির ৯৫ শতাংশই এখন উঠে গিয়েছে।টাটাদের প্রকল্প হলে সেখানকার কর্তা বা পদস্থ কর্মীদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার কথা ভেবে ২০০৬ সালেই সিঙ্গুরে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল খোলা হয়েছিল। সেই স্কুলে এখন পড়ুয়ার সংখ্যা হাতেগোনা। স্কুল-মালিকের আক্ষেপ, ‘‘মোটা ঋণ আর নিজস্ব টাকা দিয়ে স্কুল গড়েছিলাম। কিন্তু সাত মণ তেলই শুধু পুড়ল সিঙ্গুরে। কাজের কাজ কিছু হল না।’’
আর একটা বিধানসভা ভোটের মুখে সিঙ্গুরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার।
(চলবে)