ছোট ও মাঝারি শিল্পের গুরুত্বের কথা নিয়ম করে বলে থাকেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সুর শোনা যায় প্রশাসনের অনেকেরই মুখে। কিন্তু যাঁরা সেই শিল্প গড়েন, সেই শিল্প-কর্তাদেরই একাংশের দাবি, পদে পদে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ছোট ও মাঝারি শিল্পকে। কারও অভিযোগ, জেলাস্তরের প্রশাসনিক বৈঠক দীর্ঘদিন বন্ধ। কারও অভিযোগ, শিল্প তালুকের পরিকাঠামো তৈরি হলেও এখনও সেখানে জায়গা মেলেনি কারও। যা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, ছোট ও মাঝারি শিল্পের সাহায্যে রাজ্যের দাবির সত্যতা নিয়েই।
শিল্পমহলের অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ রাজ্য। রাজ্যের ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতরের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের দাবি, শিল্পমহলের অভিযোগ আদৌ সঠিক নয়। জেলাস্তরে তাঁদের দফতরের সব কার্যালয় শিল্পোদ্যোগীদের সব সময়েই সাহায্য করে চলেছে।
বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএনসিসিআই) আয়োজিত ২৮তম শিল্পমেলায় বুধবার হাজির ছিলেন বিভিন্ন জেলার বণিকসভার প্রতিনিধিরা। বিএনসিসিআই-এর প্রেসিডেন্ট জি পি সরকার এই শিল্পের প্রসারে রাজ্যের নানা উদ্যোগের কথা বলেন। কিন্তু তার উল্টো সুরই এ দিন শোনা যায় কয়েকটি জেলার বণিকসভার প্রতিনিধিদের কথায়।
যেমন পশ্চিম মেদিনীপুর চেম্বারের কার্যনির্বাহী প্রেসিডেন্ট রামগোপাল অগ্রবাল বা পশ্চিম দিনাজপুর (জেলা ভাগ হলেও বণিকসভাটি এই নামেই রয়েছে) চেম্বারের প্রেসিডেন্ট শঙ্কর কুণ্ডুর দাবি, জেলাশাসকের দফতরে আগে প্রতি মাসে একবার করে যে বৈঠক হতো সেখানে থাকতেন সব দফতরের প্রতিনিধিরাই। ফলে এক ছাদের তলায় সকলকে পেয়ে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি শিল্প তাদের সমস্যার কথা সহজে জানাতে পারত। আগের বৈঠকের সমস্যার কতটা সমাধান হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা হতো পরের বৈঠকে। অর্থাৎ, একটা ধারাবাহিক নজরদারি ছিল। রামগোপালবাবুর কথায়, ‘‘২০০৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এই বৈঠক ভাল ভাবে হলেও এখন আর তা হয় না।’’
শঙ্করবাবুর দাবি, কিছু দিন ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতরের জেলা শিল্প কেন্দ্রে এই বৈঠক হলেও তা এখন বন্ধ। ফলে সমস্যায় পড়লে শিল্পোদ্যোগীদের দৌড়তে হচ্ছে বিভিন্ন দফতরে।
এখানেই প্রশ্ন তুলছেন শিল্পমহলের অনেকে। তাঁদের বক্তব্য, জমির অভাবে রাজ্যে বড় শিল্পে এমনিতেই খরা। তার উপর তোলাবাজির জুলুমে নাভিশ্বাস উঠছে অনেক চালু শিল্প সংস্থারই। এই অবস্থায় ছোট ও মাঝারি শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তা কতটা জেলাস্তরে পৌঁছচ্ছে ? কেউ কেউ আবার এ প্রসঙ্গে তুলছেন মুখ্যমন্ত্রীর জেলা সফরের কথাও। তাঁদের প্রশ্ন, জেলাস্তরে প্রশাসনের যদি এই হাল হলে সেই সফর থেকে আদৌ কতটা লাভ হচ্ছে?
রাজ্যের অবশ্য দাবি, ছোট ও মাঝারি শিল্পের প্রসার ঘটেছে যথেষ্টই। রামগোপালবাবুর পাল্টা দাবি, সবই ভাঁওতা। জমির অভাবে বড় শিল্পের সমস্যার কথা শোনা যায়। কিন্তু জমি থেকেও ছোট ও মাঝারি শিল্পকে জমি না দেওয়ার অভিযোগ এ দিন তুলেছেন রামগোপালবাবু। তিনি জানান, পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গল এলাকায় শিল্পতালুক গড়ার জন্য সেই ২০০৯ সাল থেকে ২৫ একর জমিতে রাস্তা, বিদ্যুতের ব্যবস্থা সহ-পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এখনও সেখানে কেউ জায়গা পায়নি। তিনি বলেন, ‘‘বছর পাঁচেক আগে ২৭ জন শিল্পোদ্যোগী আবেদন করেছিলেন।’’ আর এক শিল্প-কর্তার বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী যখন শিল্প বলতে তেলেভাজা শিল্পের কথা বলেন, তখনই বোঝা যায় ছোট ও মাঝারি শিল্পের প্রতি আসলে রাজ্যের দায়বদ্ধতা কতখানি!
এ দিনের সভায় আলিপুরদুয়ার চেম্বারের কর্তা প্রসেনজিৎ দে’র অনুযোগ, আলিপুরদুয়ার জেলা তৈরি হলেও এখনও সেখানে এই দফতরের কোনও শাখা নেই। দ্রুত তা চালুর জন্য আর্জি জানান তিনি।
শিল্পমহলের অভিযোগগুলি অবশ্য মানতে নারাজ দফতরের মন্ত্রী স্বপনবাবু। এ দিনের সভায় তাঁর থাকার কথা থাকলেও অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি যেতে পারেননি। পরে ফোনে স্বপনবাবু বলেন, ‘‘কে কী বলেছেন, জানি না। তবে অভিযোগ সত্যি নয়। জেলায় দফতর থেকে সব সময়েই নজরদারি থাকে। বৈঠকও হয়। শিল্প গড়তে সব সাহায্য করা হয়।’’
শুধু শিল্প প্রতিনিধিই নন, রাজ্যের হস্তশিল্পের এক করুণ ছবির কথা উঠে আসে নাবার্ডের আধিকারিকের মুখেও। নাবার্ডের এজিএম সারদা নাথ জানান, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে বালুচরি শাড়ির কোঅপারেটিভ সোসাইটি-র ১৫৯ জন সদস্যের মধ্যে এখন মাত্র ১৬ জন কর্মরত। বাকিরা হয় শাড়ি তৈরি বন্ধ করে দিয়েছেন বা অন্য
কাজে চলে গিয়েছেন। সেই সোসাইটিকে পুনরুজ্জীবনে সাহায্য করতে ‘পাইলট’ প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।