মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিধানসভা ভোটের আগে তড়িঘড়ি ‘যুব সাথী’ প্রকল্প চালু করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কর্মহীনদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আগামী ১ এপ্রিল থেকেই মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু হচ্ছে বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক শিবির। কিন্তু যাঁরা ওই সরকারি সাহায্যের জন্য আবেদন করবেন, তাঁরা সত্যিই কর্মহীন কি না, তা যাচাই করার উপায় সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মিলছে না সরকারি স্তরে। আবেদনপত্রের সঙ্গে থাকা স্বেছা-ঘোষণাই আপাতত সরকারের ভরসা!
রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে ‘যুব সাথী’ প্রকল্পের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়া। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, ‘‘২১ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত মাধ্যমিক পাশ করা উপভোক্তারা পাঁচ বছর আপাতত এই সুবিধা পাবেন। তার পরে পুনর্বিবেচনা করা হবে, যত দিন তাঁরা চাকরি না পান।’’ মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরে ‘যুব সাথী’ প্রকল্পের জন্য যে আবেদনপত্র তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি বা বাতিল চেক এবং মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষার মার্কশিট অথবা শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে শংসাপত্র দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী শিক্ষাগত বৃত্তি ছাড়া সরকারি আর কোনও সুবিধা পান কি না, জানাতে হবে। সেই সঙ্গেই অঙ্গীকার করতে হবে, আবেদনকারী এখন বেকার, কোনও ভাতার আওতায় নেই এবং তাঁর দেওয়া কোনও নথি বা তথ্য অসত্য প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ‘দুয়ারে সরকার’-এ নথিভুক্তির নম্বর দিয়ে আবেদনপত্র গৃহীত হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থাকছে, বেসরকারি, অসংগঠিত বা ব্যবসায়িক নানা ক্ষেত্রে কর্মরত কেউ এই ভাতার জন্য আবেদন করে থাকলে ঝাড়াই-বাছাই হবে কী ভাবে? প্রশাসনিক কর্তাদের বড় অংশই মানছেন, এমন কোনও ‘চেক পয়েন্ট’ নেই। চালু কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা গোপন রেখেও কেউ যদি আবেদন করেন, সেটাও চটজলদি ধরা মুশকিল। কারণ, সব প্রকল্পের উপভোক্তার অভিন্ন তথ্যভান্ডার নেই রাজ্যের। সে ক্ষেত্রে প্রকল্প ধরে ধরে যাচাই করতে হবে এবং তা সময়সাপেক্ষ। সরকারি নির্দেশিকায় অবশ্য বলা হয়েছে, আবেদনের পর সরকারি আধিকারিকরা তা যাচাই করবেন। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রথম ৫০০ টাকা দিয়ে ‘বেকার ভাতা’ চালু হয়েছিল। তখন এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম আছে কিন্তু চাকরি পাননি, এমন যুবক-যুবতীদের সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এখন এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের ব্যাপার নেই।
বিজেপির অর্থনীতিবিদ-বিধায়ক অশোক লাহিড়ীর প্রশ্ন, ‘‘বাজেটে এক রকম ঘোষণা করে বাইরে সেটা অন্য রকম করে দেওয়া হল, এটা কী করে নিয়মসিদ্ধ হতে পারে? এখানে কত জন প্রাপক হতে পারেন, তার আন্দাজ নেই। তা হলে অর্থ খরচের হিসেব ধরা হবে কী ভাবে! তবে কি তৃণমূলের দাদারা বলে দিলেই ভাতা পেয়ে যাবেন এলাকার লোক? বোঝাই যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী ভোটের ঝুলি ভরতে চাইছেন!’’
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, মমতার সরকার ২০১৩ সালে ‘যুব উৎসাহ প্রকল্প’ ঘোষণা করেছিল, পরে সেটাই হয়েছিল ‘যুবশ্রী’। সেই প্রকল্পে ১৭ লক্ষ আবেদনকারীর মধ্যে এক লক্ষ অল্প সময়ের জন্য সহায়তা পেয়েছিলেন, বাকিরা নাম লিখিয়ে বসে থেকেছেন! ওই ১৭ লক্ষকে নিয়ে আগে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি তুলেছেন তিনি। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর যুক্তি, ‘‘বাম আমলে যত দিন না কাজ হচ্ছে, কর্মপ্রার্থীদের ভাতা দেওয়া চালু হয়েছিল এক্সচেঞ্জ থেকে নাম নিয়ে। চাকরি পেলে ভাতায় নাম কেটে যেত। এখন সরকারের মনোভাব হচ্ছে, কাজের কোনও নিশ্চয়তা নেই, ভাতা চলুক। সেই জন্যই স্পষ্ট রূপরেখা নেই।’’
‘যুব সাথী’র শিবির ও আবেদন নেওয়া হবে যুবকল্যাণ দফতরের মাধ্যমে, অরূপ বিশ্বাসের ইস্তফার পরে এখন যে দফতর রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই। এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে শ্রম দফতরের সঙ্গে সরকারি স্তরে কোনও আলোচনা হয়নি। শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক মুখ খুলতেও চাননি। তবে বর্ষীয়ান এক মন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘কিছু প্রশ্ন আছে, এটা ঠিক। আশা করতে হবে, সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে অনৈতিক ভাবে কেউ সুবিধা নেবেন না।’’
ভরসা আপাতত ‘সদিচ্ছা’য়!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে