শুভেন্দু অধিকারী। — ফাইল চিত্র।
রাজ্যের আর্থিক হাল ফেরাতে কেন্দ্রের থেকে বিশেষ প্যাকেজ চাওয়ার পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। যে ভাবে কেন্দ্রের থেকে বিশেষ প্যাকেজ পেয়েছিল প্রতিবেশী বিহারও। পাশাপাশি, রাজস্ব-লোকসানের পথগুলি বন্ধ করে অর্থ-ভান্ডার মজবুত করার প্রস্তুতিও শুরু করল নতুন বিজেপি সরকার। এমনিতে কোষাগারের হাল বেশ নড়বড়ে। বেহিসেবি খরচের কারণে আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় ভাঁড়ারের পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। তার উপর ভোটের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গেলেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন নতুন সরকারের। রয়েছে বকেয়া ডিএ দেওয়ার দায়ও। সব মিলিয়ে সে সব সামলে, ধারের বোঝা কমিয়ে, খেলা-মেলা-উৎসবে অপ্রয়োজনীয় খরচ আটকে নিজস্ব আয় বাড়ানোর পথ খুঁজছেন অর্থ-কর্তারা।
‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ হওয়ার সুবাদে কেন্দ্রের থেকে বিশেষ প্যাকেজ পাওয়া গেলে, তা রাজ্য অর্থনীতির পালে বাতাস জোগাবে। এ রাজ্যের বাজেট প্রায় চার লক্ষ কোটি টাকার হলেও, তাতে পরিকাঠামো খাতে বরাদ্দ নেহাতই অল্প। বরং খেলা-মেলা-উৎসব-ভাতা ইত্যাদিতে আয়ের একটা বড় অংশ খরচ হয়। স্বাভাবিক ভাবেই মূলধনী তথা পরিকাঠামো বা স্থায়ী সম্পদ তৈরির কাজ, যে খাতে বরাদ্দ বাড়লে আর্থিক কর্মকাণ্ড থেকে কর্মসংস্থান, নানা পথ খুলে যায়, সেটাই বেশি ধাক্কা খেয়েছে। অর্থ-কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, এই কারণে পরিকাঠামো খাতে কেন্দ্রের কাছে বিশেষ প্যাকেজের আর্জি রাখতে চলেছে নবান্ন। সেই অর্থ পাওয়া গেলে এক দিকে সামাজিক তথা অনুদান-প্রকল্পগুলি চালানো সম্ভব, অন্য দিকে দীর্ঘস্থায়ী আয়ের লক্ষ্যে পরিকাঠামো খাতে বিপুল খরচ করা যেতে পারে। এই পরিকল্পনার আওতায় সড়ক, সেতু, সমুদ্র বন্দর, নদী বন্দর ইত্যাদির নির্মাণের প্রস্তাব থাকা স্বাভাবিক। এ রাজ্যের নদীপথ জাতীয় ‘ওয়াটারওয়ে-১’ মর্যাদাপ্রাপ্ত। ফলে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, দুই ২৪ পরগনা দিয়ে বয়ে আসা হুগলি নদীতে পণ্য পরিবহণের পরিকাঠামো নির্মাণ হতে পারে। তাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। রাজস্ব বাড়বে রাজ্যের।
পরিকাঠামো খাতেই কেন বিশেষ প্যাকেজের পরিকল্পনা?
এ রাজ্যের ঘাড়ে প্রায় আট লক্ষ কোটি টাকার দেনা রয়েছে। তা মকুবের আর্জি কেন্দ্রের কাছে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। অতীতে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছে বিগত তৃণমূল সরকার এই প্রস্তাব দিলেও কাজ হয়নি। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের ঋণ মকুব করতে হলে বাকি অনেক রাজ্য একই দাবি তুলবে। যা মেটানো কেন্দ্রের পক্ষে সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, ধার করা যেতেই পারে। কিন্তু তা খরচ হওয়া উচিত পরিকাঠামো তথা মূলধনী খাতেই। তাতে ধার শোধের অঙ্ক উঠে আসে সেই সব প্রকল্প থেকেই। অথচ এ রাজ্যে এত দিনের রীতি বলছে, ধার শোধের টাকার বেশির ভাগটা জোগাড় হত ধার করেই। যা সুস্থ অর্থনীতির সঙ্গে মানানসই নয়।
প্রতিবেশী বিহারকে এমন বিশেষ প্যাকেজ দিয়েছিল কেন্দ্র। তথ্য বলছে, সে রাজ্যে শুধু গঙ্গার উপরেই একাধিক সেতু তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। যার ফলে পরিকাঠামোয় যেমন লগ্নি হয়েছে, তেমনই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় শিল্প বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। যদিও একটি মহলের দাবি, বিহারের কিছু সেতুর কাজ নিয়ে বেনিয়মের অভিযোগও আছে।
কর্তাদের অনেকে জানাচ্ছেন, নতুন সরকার খেলা-মেলা-উৎসবের ব্যয় খতিয়ে দেখে অপ্রয়োজনীয় খরচ আটকাবে। আবগারিও সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে বন্ধ করা হবে অর্থের অপচয়। চালু কোনও সামাজিক প্রকল্প বন্ধ না করলেও, যোগ্য উপভোক্তা বাছাই এবং টাকা দেওয়ার পদ্ধতি হবে এক-জানলা। এক কর্তার কথায়, “রেভিনিউ লিকেজ বা বেআইনি কাজের ফলে রাজস্ব ক্ষতি রুখতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ শক্ত হলে তাতে হাতে অনেক টাকা থাকবে।” এই ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, সব ধরনের রাজস্ব ক্ষতি আটকানো এই সরকারের অগ্রাধিকার। প্রশাসনিক কাজে খরচও যে কমানো হবে, তার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি এ দিন আরও বলেন, ‘‘এর আগের সরকার প্রশাসনিক সভায় দুই থেকে চার কোটি টাকা খরচ করত। আমরা সেটুকুই করেছি, ন্যূনতম যেটুকু না করলেই নয়।’’
পুরুলিয়ায় লিথিয়াম, তামা এবং ফসফেট উত্তোলনের পরিকল্পনাও শুরু করেছে নবান্ন। তা সফল হলে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) থেকে অপ্রচলিত শক্তি ক্ষেত্র, সেমিকনডাক্টর থেকে রাসায়নিক শিল্পের অভিমুখ এ রাজ্যের দিকে ঘুরতে পারে। খনিজের রাজস্ব আসবে পৃথক ভাবে। সব মিলিয়ে তাই ভারসাম্যের অর্থনীতির উপরে জোর দিচ্ছে নতুন সরকার।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে