West Bengal DA Case

ডিএ মামলায় তেরোর গেরো ছাড়াল সুপ্রিম কোর্ট! সংশয়ের জাল কাটিয়ে কী কী পর্যবেক্ষণ শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতির

শীর্ষ আদালত বলেছে, যদি বাস্তবে জীবনধারণের খরচ মেটাতে না পারে বেতন, তা হলে তা অর্থহীন। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নাগরিকদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার রয়েছে। ডিএ না দিলে এই অনুচ্ছেদে দেওয়া অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:০০
Share:

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মহার্ঘভাতা (ডিএ) কর্মচারীদের জন্য প্রশাসনিক সুবিধা না কি অধিকার? এই নিয়ে কি তাঁরা আদৌ সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা রাখতে পারেন? বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে মহার্ঘভাতা মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকার এবং সরকারি কর্মী— এই দু’পক্ষের সওয়াল জবাবে প্রায় ১৩টি প্রশ্ন উঠে এসেছে। সেই বিষয়ে বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ নিজেদের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে।

Advertisement

সেই প্রশ্ন এবং তার জবাব রইল আনন্দবাজার ডট কমে।

এক, সংবিধানের ৩০৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাজ্য কি ইচ্ছামতো কর্মচারীদের ডিএ নির্ধারণ করতে পারে?

Advertisement

শীর্ষ আদালত বলছে, সরকারি কর্মীদের বেতন ও ভাতা সংক্রান্ত নিয়ম তৈরি করতে পারে রাজ্য, এতে সন্দেহ নেই। নিয়ম তৈরির অধিকার মানে খেয়ালখুশি মতো কাজের অধিকার নয়। এই মামলায় রাজ্য সরকার ‘রোপা রুল ২০০৯’ মেনে নিয়েছে। সেখানে যা আছে, সবটাই মানতে হবে রাজ্যকে। এক বার তা কার্যকর হলে রাজ্য বলতে পারে না, আমরা চাইলে দেব, না চাইলে দেব না।

দুই, ডিএ কি শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নাকি আইন সম্মত অধিকার?

শীর্ষ আদালত বলেছে, ডিএ প্রশাসনিক সুবিধা নয়। এটা আইনি অধিকার। কারণ, রোপা রুলসের মাধ্যমে ডিএ স্বীকৃত। সরকারি মেমোরেন্ডাম দ্বারা কার্যকর করা হয় মহার্ঘভাতা। অর্থাৎ সরকার নিজে এই অধিকার তৈরি করেছে। এক বার যখন কোনও ভাতা নিয়মের অন্তর্ভুক্ত হয়, কর্মীদের নির্দিষ্ট হারে, পদ্ধতিতে দেওয়ার কথা বলা হয়, তখন তা আইনি অধিকার হয়ে যায়।

তিন, সরকার কি অনুগ্রহ মনে করে ডিএ দেবে?

শীর্ষ আদালত এই যুক্তি খারিজ করেছে। তারা বলেছে, ডিএ কোনও দান নয়। কর্মচারীর পরিশ্রমের সঙ্গে জড়িত। এটি বেতনের প্রকৃত মূল্য রক্ষা করার উপায়। মুদ্রাস্ফীতির জন্য কর্মচারীরা দায়ী নন। মুদ্রাস্ফীতির ভার কর্মীচারীকে বহন করতে বাধ্য করা অন্যায়।

চার, ডিএ না দিলে কর্মচারীর সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয় কি?

শীর্ষ আদালত বলেছে, যদি বাস্তবে জীবনধারণের খরচ মেটাতে না পারে বেতন, তা হলে তা অর্থহীন। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নাগরিকদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার রয়েছে। ডিএ না দিলে এই অনুচ্ছেদে দেওয়া অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে।

পাঁচ, রাজ্যের কাছে ডিএ নিয়ে কি কর্মচারীদের প্রত্যাশা থাকা উচিত?

সুপ্রিম কোর্ট বলছে, পশ্চিমবঙ্গে সরকার আগে নিয়মিত ডিএ দিয়েছে। বছরে দু’বার ডিএ দিয়েছে। এআইসিপিআই (অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স) অনুসরণ করে মহার্ঘভাতা দেওয়া হয়েছে। এই যে আচরণ রাজ্য আগে করেছে, তার কারণে কর্মীদের প্রত্যাশা রয়েছে যে, তারা ডিএ পাবেন নিয়ম মেনে। হঠাৎ করে বন্ধ করা, নীতি না মানা— তা হতে পারে না।

ছয়, রাজ্য ও কেন্দ্রের বেতন, ভাতা কি একই হওয়া উচিত?

শীর্ষ আদালত বলছে, রাজ্য সরকারি কর্মীদের বেতন, ভাতা নির্ধারণ রাজ্যের বিষয়, এটা ঠিক। কিন্তু সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেই সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করা যায় না। তোমাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতার অধিকার দেওয়া হয়নি।

সাত, রাজ্যের আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা থাকার কারণে কি কর্মীদের ডিএ না-দেওয়া যায়?

সুপ্রিম কোর্ট বলছে, ফিসকাল অটোনমি অর্থাৎ আর্থিক স্বায়ত্তশাসন। এটা হল বাজেট তৈরি করার স্বাধীনতা। তার অর্থ কর্মচারীদের অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়। তাঁদের আইনি অধিকার দিতে হবে। কর্মীদের অধিকারকে অস্বীকার করা যায় না।

আট, হাই কোর্টের প্রথম রাউন্ডের যে রায় ছিল, তা মানা কি বাধ্যতামূলক?

শীর্ষ আদালত বলছে, প্রথম রাউন্ডে হাই কোর্ট বলেছিল, ডিএ আইনি অধিকার। রাজ্য ইচ্ছামতো বন্ধ করতে পারে না। তুমি গিয়ে বলছো, টাকা নেই, আমরা বাধ্য নই। তোমাকে আগের রায় মানতে হবে। একই বিষয়ে বার বার যুক্তি দিতে বা সওয়াল করতে পারো না।

নয়, বছরে দু’বার ডিএ পাওয়া কর্মীদের কি অধিকার?

শীর্ষ আদালত বলেছে, আইনে লেখা নেই যে অবশ্যই বছরে দু’বার ডিএ দিতে হবে। কিন্তু রাজ্য নিজেই সেই পদ্ধতি অবলম্বন করে নিয়েছিল। উপযুক্ত যুক্তি না থাকলে তা এখন বন্ধ করতে পারবে না।

দশ, টাকার অভাব কি আইনি অধিকার নষ্ট করতে পারে?

সুপ্রিম কোর্ট বলছে, টাকার জন্য আইনি অধিকার নষ্টের যুক্তি খারিজ করা হচ্ছে। সরকার এই যুক্তি দেখালে নাগরিকদের কোনও অধিকার টিকে থাকবে না। পানীয় জল, খাদ্যের অধিকার নষ্ট হবে।

এগারো, আদালত কি আর্থিক নীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে?

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, এমনিতে তারা আর্থিক নীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কিন্তু যখন রাজ্যের কোনও নীতি, নিয়ম খামখেয়ালি, বৈষম্যমূলক, সাংবিধানিক অধিকারের বিরুদ্ধে হয়, তখন আমরা হস্তক্ষেপ করব। সেই হস্তক্ষেপ তখন বাধ্যতামূলক।

বারো, ডিএ কি কর্মীদের মৌলিক অধিকার?

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, ডিএ কর্মীদের মৌলিক অধিকার, এটা হাই কোর্ট বলেছে। কিন্তু এই আদালতের কাছে কোনও পক্ষ সেই প্রশ্ন করেনি। তাই এই প্রশ্নের উত্তর শীর্ষ আদালত এখন দিচ্ছে না। আগামী দিনে এমন কোনও মামলা যদি রুজু হয়, তখন এই প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর দেবে শীর্ষ আদালত। আমায় এখন এই নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা হয়নি।

তেরো, বকেয়া মেটাতে এতটা দেরি হল, তার জেরে দাবি কি খারিজ হবে?

শীর্ষ আদালত বলছে, ডিএ ‘রেকারিং কল’। কর্মীদের প্রতি মাসে নতুন অধিকার তৈরি হয়। ২০০৯ সালের অগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ডিএ বকেয়া রয়েছে। দেরি হয়েছে, সেই যুক্তি দেখিয়ে রাজ্য কারও দাবি বাতিল করতে পারে না।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি করোল এবং বিচারপতি মিশ্রের বেঞ্চ জানিয়ে দিল, ডিএ সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার। রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএর ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতেই হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। ২৫ শতাংশ দ্রুত মেটানোর পর বাকি ৭৫ শতাংশ কী ভাবে দেওয়া হবে, তার একটা রূপরেখাও তৈরি করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০০৯ সালের অগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যে ডিএ বকেয়া রয়েছে, এই রায় তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই মুহূর্তে কেন্দ্র এবং রাজ্যের ডিএ-র মধ্যে যে ফারাক রয়েছে (৪০ শতাংশ, যা এপ্রিল থেকে কমে ৩৬ শতাংশ হবে) তার ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়। রাজ্যের ‘আর্থিক বোঝা’র বিষয়টিও বৃহস্পতিবারের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement