গ্রামে ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ানোয় ব্যর্থ রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর পল্লি চিকিৎসক বা চলতি কথায় হাতুড়ে ডাক্তারদের অস্তিত্ব মেনে নিয়েছিল। সেই অনুযায়ী দু’লক্ষ হাতুড়ে ডাক্তারকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকারও। গত নভেম্বরে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই জানিয়েছিলেন সেই সিদ্ধান্তের কথা। কিন্তু তার আট মাস পরেও প্রশিক্ষণের কোনও ব্যবস্থাই হয়নি। এমতাবস্থায় সরকারি ‘উদাসীনতা’র বিরুদ্ধে এ
বার আন্দোলনে নামছেন খোদ হাতুড়েরাই।
স্বাস্থ্য দফতর জানাচ্ছে, রাজ্যের ৩৮ হাজার গ্রামে হাতুড়ে ডাক্তারের সংখ্যা প্রায় দু’লক্ষ। আর রাজ্যে নথিভুক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ৪০ হাজারের কিছু বেশি। এই ৪০ হাজারের ৮০ ভাগই কাজ করেন শহরের হাসপাতালগুলিতে। অর্থাৎ গ্রামের জন্য বরাদ্দ বড়জোর ৮ হাজার চিকিৎসক। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে গ্রামে চিকিৎসা ব্যবস্থার চাবিকাঠিটা কাদের হাতে। তাই হাতুড়ে চিকিৎসকেরা এ বার আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কিছুটা চাপে স্বাস্থ্যভবন। হাতুড়ে চিকিৎসকদের একটি সংগঠন জানিয়েছে, আজ, বুধবার, স্বাস্থ্য ভবন অভিযান করবে তারা। আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হবে জেলাগুলিতেও।
মুখ্যমন্ত্রী যে প্রকল্পে সিলমোহর দিয়েছেন, আট মাস পরেও কেন তা শুরু হল না? এক কর্তার কথায়, ‘‘কিছু স্বাস্থ্য-কর্তার প্রতিকূল মনোভাবই সমস্ত পরিকল্পনা বানচাল করে দিচ্ছে।’’ কাদের এই প্রতিকূল মনোভাব? মুখ্যমন্ত্রীর সম্মতির পরে কেনই বা সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? যাঁর উপরে এই প্রকল্প শুরু করার দায়িত্ব ছিল, সেই স্বাস্থ্য সচিব রাজেন্দ্র শুক্ল অবশ্য এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্যই করতে চাননি।
হাতুড়ে ডাক্তারদের সংগঠন পল্লি চিকিৎসক সংযুক্ত সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক কুশল দেবনাথ বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পরেও কী ভাবে একটা পরিকল্পনা নিয়ে এমন টালবাহানা চলতে পারে! এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ছবিটা পুরোপুরি বদলে যেতে পারত।’’
যদিও হাতুড়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার যাঁরা বিরোধী তাঁরা বলে থাকেন, ওই তথাকথিত চিকিৎসকেরা নামের আগে ডাক্তার পরিচয় লেখেন, অস্ত্রোপচার করেন, যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করেন, রোগ গুরুতর বুঝেও রোগীকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে নিজের হাতে রেখে দেন ইত্যাদি। তাঁদের প্রশিক্ষণ দিলে হিতে বিপরীত হওয়ার ভয়ই বেশি। এঁদের চাপেই মুখ্যমন্ত্রীর অনুমোদিত সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারছে না বলে স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা জানিয়েছেন।
তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হাতুড়ে ডাক্তারদের যথার্থ ভাবে কাজে লাগানো নিয়ে গত কয়েক বছরে বেসরকারি ভাবে কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে। হাওড়ায় একটি প্রকল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা শল্য চিকিৎসক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সরকারি তরফে এখনই সামগ্রিক ভাবে পল্লি-চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ চালু করা না গেলেও অন্তত পাইলট প্রোজেক্ট হিসেবে কোনও একটি জেলায় তা শুরু করা দরকার। এক বছর প্রশিক্ষণ দিয়ে নজর রাখলেই বোঝা যাবে পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হল। তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’’ হাতুড়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করছে অন্য একটি বেসরকারি সংস্থাও। তাদের প্রশিক্ষণের মূল্যায়নের কাজ করছে বিশ্বব্যাঙ্ক।
প্রশিক্ষণ নিয়ে এই মত-পাল্টা মতের মধ্যে কোন দিকে পাল্লা ভারী হয়, আপাতত তার উপরেই নির্ভর করছে পল্লি চিকিৎসকদের ভবিষ্যৎ।