—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
খোদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর নাম হয়েছে জয় মলয়া। তাঁর বোন আইনজীবী দ্যুতিমালা বাগচীর নাম দ্যুতীমলা। ভোটার তালিকার এমনই মহিমা, জনৈক জয়াশিস হয়েছেন জযাশইস, জয়াদিত্যর রূপান্তর জযদীত্যয়।
চট্টোপাধ্যায় বা চ্যাটার্জিকে তাও চটরজী বা চটর্জী বললে চেনা যাচ্ছে। সিংহ বা সিনহা বাংলা ভাষায় ‘সীংহা’, দে ‘ডেয়’, রায় 'রঈ' হয়ে ওঠায় বাকরুদ্ধ অনেকেই। উত্তর কলকাতার ভোটার সন্দীপ সাহা রহস্যময় কারণে ‘সংদীপ তসাহা’ হয়ে গিয়েছেন। ব্রতী সেনগুপ্ত ‘ভরতি সেঙ্গুপ্তা’ হওয়ায় তাঁকে খুঁজে পায় কার সাধ্য।
একই ভাবে আব্দুল গনি বলে পরিচিত ভদ্রজন, যিনি আঃ গনি লেখেন বাংলায়, ইংরেজিতে তাঁর নাম ‘আহ গনি’ হয়েছে। মহম্মদমেহেবুব ‘মহা মাহাবুব’-এ পরিবর্তিত। হাই কোর্টের উকিল মাসুদ করিম বাংলায় তাঁর নাম খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরে দেখেন, ‘মুসুর কুমির’। সব মিলিয়ে ২০২৬এ প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বাংলা ও বাঙালির নাম, পদবি গবেষণার অমূল্য দলিল বলে চিহ্নিত হতে পারে। কিংবা বৃহদায়তন এক নামাঞ্জলি সমগ্র। বাঙালি নামের বানানের যত রকম সম্ভবপারমুটেশন-কম্বিনেশন (বিন্যাস ও সমাবেশ) এই ভোটার তালিকায় মজুত। যাঁর নাম সুদীপ্ত, তিনি হয়েছেন সুদীপ্তা, অমিয়ধন ‘অমিয়াধান’ হয়ে গিয়েছেন। বসু কখনও বাসু বা বোর্স, ঘোষের গোশ-এ পরিবর্তন তো সাদামাটা ব্যাপার।
জনৈক বিএলও-র ব্যাখ্যা, “বাংলায় নাম নথিবদ্ধ করার সময়ে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মানতে হয়েছে। নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা অ্যাপে কমিশনের মজুত করা লিপিতে বাংলা নামগুলিও রোম্যান অক্ষরে লিখতে হয়! রঞ্জিত লিখতে ইংরেজির আর, এ, এন লিখলেই তা বাংলায় ‘রং’ হয়ে যাচ্ছিল কিংবা শ্রাবণী হচ্ছিল শ্রাবানি কিছুতেই শুধরোকে পারিনি।”
নির্বাচন কমিশন অবশ্য এ ক্ষেত্রে পুরো দায়টাই কার্যত বিএলও, ইআরও, এইআরও এবং রাজ্য সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চেয়েছে। যন্ত্রের ভুলটাকে তারা অনেকে ক্ষেত্রেই ‘ব্যক্তির অসতর্কতা’ বলে দাবি করছে। কমিশনের দাবি, প্রশিক্ষণ পর্বেই বিএলও, ইআরও-এইআরওকে বলা হয়, কোনও নামের বানানে বিকৃতি হলে তা স্থানীয় স্তরেই শুধরোতে হবে। দেখা যাচ্ছে, সেই সংশোধনহয়নি। বিএলওদের বা বাকি আধিকারিকদের উপরে কাজের চাপ থাকলেও এটা করার কথা ছিল। কমিশনের আরও দাবি, বিএলওদের সহযোগিতার জন্য ১০০০ জন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রাজ্য দেয়নি। রাজ্য প্রশাসনের একটি অংশ যদিও পাল্টা বলছে, অল্প সময়ে তাড়াহুড়োয় এত কাজই নষ্টের গোড়া।
ইংরেজি বানানের ক্ষেত্রে গরমিল তুলনায় কম বলেই অবশ্য কমিশনের দাবি। তবু বিভিন্ন জনের নাম, পদবির বানানের অসঙ্গতি এবং অন্য নথির বানানের সঙ্গে নতুন করে তৈরি ভোটার তালিকার বানানের ফারাক নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তবে ভোটের আগে এই নিয়ে আবেদনের সাহস সবার নেই। কারণ চোরা আশঙ্কা, সামান্য জলঘোলা হলে নিজের নামটাই না ‘বিবেচনাধীন’ তকমা পেয়ে যায়। তা ছাড়া, ভবিষ্যতে ভোটার তালিকা ফের পরিমার্জন হলে এই নামের ভুলে কোন অনভিপ্রেত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা কে বলতে পারে। তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতেই, এই উদ্ভট বানানে ভরপুর ‘অপাঠ্য’ তালিকার দায় কমিশন এড়াতে পারে না। তাঁদের মতে, তথ্য যাচাইয়ের যে সফটওয়্যার কমিশন তৈরি করেছিল, তাতে আরও সবিস্তার ‘ইনপুট’ থাকা জরুরি ছিল, বিশেষ করে নামের বাংলা এবং ইংরেজি বানানের ক্ষেত্রে। তা না থাকায় যন্ত্র তার মতো করে সীমিত পরিসরে ইংরেজি বানানের বাংলা রূপ দিয়েছে। তাতেই বাংলা ভাষায় এত ভুলভ্রান্তির ছড়াছড়ি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে