(বাঁ দিক থেকে) মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। — ফাইল চিত্র।
এ বার নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠালেন শুভেন্দু অধিকারীও। সোমবার দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে চার পাতার একটি চিঠি লিখেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগগুলি তুলেছেন, সবই ওই চিঠিতে ‘খণ্ডন’ করেছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কাজ নিয়ে নিজস্ব মতামতও জানিয়েছেন তিনি। বুঝিয়ে দিয়েছেন, চলতি প্রক্রিয়ায় সমর্থনই রয়েছে তাঁর।
গত শনিবারই জ্ঞানেশকে চিঠি পাঠান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চিঠিতে এসআইআর প্রক্রিয়ায় একগুচ্ছ অনিয়মের অভিযোগ তোলেন তিনি। সেই অভিযোগগুলিই ‘খণ্ডন’ করতে এ বার জ্ঞানেশকে পাল্টা চিঠি পাঠালেন শুভেন্দু। চার পাতার ওই চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের আদ্যন্ত বিরোধিতাই করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী এসআইআর প্রক্রিয়ার ‘মিথ্যা ব্যাখ্যা’ করছেন। পাঁচ দফা মোটা দাগে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিশনকে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন বিরোধী দলনেতা।
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এমনকি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এসআইআর প্রক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে চলছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি। অন্য দিকে জ্ঞানেশকে পাঠানো চিঠিতে শুভেন্দুর দাবি, অকারণ তাড়াহুড়ো এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভুল উপস্থাপন করা হয়েছে। গোটা দেশে আলোচনা এবং প্রশিক্ষণের পরেই তা চালু হয়েছে। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ৫০ হাজার বিএলও এবং ইআরও-কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি শুভেন্দুর।
গত শনিবার মমতা অভিযোগ করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন মানদণ্ড স্থির করেছে নির্বাচন কমিশন। এই প্রসঙ্গে বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ দেন তিনি। অভিযোগ করেন যে, বিহারে এসআইআর-এর ক্ষেত্রে বংশতালিকা (ফ্যামিলি রেজিস্টার)-কে বৈধ পরিচয়পত্র হিসাবে গ্রহণ করা হলেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। এই অভিযোগেরও নিজস্ব ব্যাখ্যা করেছেন শুভেন্দু। বিধানসভার বিরোধী দলনেতার দাবি, রাজ্যভিত্তিক স্তরে নিয়মবিধি বদলানো স্বেচ্ছাচারিতা নয়। বরং, এটি যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর প্রতিফলন বলেই ব্যাখ্যা করছেন তিনি।
গত শনিবার সাড়ে কমিশনকে পাঠানো তিন পাতার চিঠিতে বিস্তর অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।প্রথাগত বিজ্ঞপ্তি বা বিধিবদ্ধ নির্দেশিকা ছাড়াই কমিশন হোয়াট্সঅ্যাপের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতি দিন নিত্যনতুন নির্দেশ দিচ্ছে বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতেও আপত্তি জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, বর্তমান যুগে হোয়াটস্অ্যাপের মতো ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে নির্দেশ দেওয়ার চল রয়েছে। যখন কোনও কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে, তখন দ্রুত কোনও বিষয় স্পষ্ট করতে এটি উপযোগী মাধ্যম। পরে প্রয়োজন অনুসারে আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা বা গেজ়েট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। শুভেন্দুর বক্তব্য, দৈনন্দিন আপডেটের যে কথা মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, তা আসলে কোনও ‘বিভ্রান্তি’ নয়। এর মাধ্যমে কমিশনের ‘সক্রিয় দৃষ্টিভঙ্গি’ই প্রকাশ পায়।
ইআরও-দের অনুমতি ছাড়াই কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা (আইটি সিস্টেম)-র অপব্যবহার করে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগও তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে শুভেন্দুর দাবি, এমন অভিযোগগুলি ‘গায়ে জ্বালা ধরানো এবং কল্পনাপ্রসূত’। যে সকল নাম বাদ যাচ্ছে, তা আইন মেনেই হচ্ছে বলে জ্ঞানেশকে পাঠানো চিঠিতে দাবি করেছেন বিরোধী দলনেতা।
এসআইআরের শুনানি প্রক্রিয়ায় হেনস্থার অভিযোগ তুলেও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কারও নামের বানান ভুল থাকলে কিংবা বয়সের ফারাক থাকলে ভোটারদের হেনস্থা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। তবে শুভেন্দুর দাবি, নামের বানান বা বয়সে অমিল ধরা পড়লে তা যাচাই করে নেওয়ারই নির্দেশ দেওয়া হয়। যাতে সব নির্ভুল হয়, এটিই তার শ্রেষ্ঠ উপায়। তাঁর আরও দাবি, নির্দিষ্ট কারণ, কী কী নথি লাগবে সবই জানিয়ে দেওয়া হয় শুনানির নোটিস জারি করার সময়ে। বয়স্কদের সমস্যার যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা-ও হাতেগোনা বলে দাবি শুভেন্দুর। জ্ঞানেশকে তিনি লেখেন, এই ধরনের অভিযোগগুলি রং চড়িয়ে বলা হচ্ছে।
এসআইআর-এর কাজে পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং শুনানিকেন্দ্রে বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ)-দের ঢুকতে না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতার এই অভিযোগেরও বিরোধিতা করেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, কমিশনের পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়। স্থানীয় স্তরে পক্ষপাতিত্ব দূর করার ক্ষেত্রেও এই নিয়োগ উপযোগী বলেই মনে করছেন শুভেন্দু। বস্তুত, রাজ্যে এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত মাইক্রো অবজ়ার্ভারেরা সকলেই কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী। সেই কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু লিখেছেন, এই পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের কোনও যোগ নেই। ফলে তাঁরা ‘নিরপেক্ষ আধিকারিক’ বলেই মনে করছেন তিনি। বিএলএ-রা শুনানিকেন্দ্র না থাকার ফলে সেখানকার নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে বলেও মনে করছেন বিরোধী দলনেতা।