গ্রামের মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করল গ্রামেরই ছেলে! ঘাটালের এই ঘটনায় কুঁকড়ে গিয়েছেন গ্রামের মেয়ে বউরা। প্রশ্ন তুলছেন, ‘পাড়াতেও কি তবে আমরা আর নিরাপদ নই!’
সরস্বতী পুজো উপলক্ষে ঘাটালের ওই গ্রামে স্থানীয় একটি ক্লাব জলসার আয়োজন করেছিল রবিবার সন্ধ্যায়। এলাকার ছেলে-মেয়েরাই নাচ-গান পরিবেশন করছিল। তা দেখতে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ওই নাবালিকা ঠাকুমার সঙ্গে গিয়েছিল। পরে তার বাবা-মাও যান। সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ বাবা-মা বাড়ি ফিরে গেলে ঠাকুমার সঙ্গেই অনুষ্ঠান দেখতে থেকে যায় ওই কিশোরী। জলসাতেও তখন থিকথিকে ভি়ড়। রাত ন’টা নাগাদ সমর ও স্বরূপ অনুষ্ঠানের মাঝেই ওই নাবালিকাকে ইশারা করে ডাকে। চেয়ার থেকে উঠে যায় মেয়েটি। পরে ওই কিশোরী জানিয়েছে, ওই দুই যুবক তাকে পাশের খাঞ্জাপুরে আর একটা জলসায় নিয়ে যাবে বলে। পরিচিত পাড়ার দাদাদের না বলার কথা মনে হয়নি কিশোরীর। অভিযোগ, বাইকে চাপিয়ে আধ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে একটি মাঠের মধ্যে স্বরপ ওই স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করে। সমর ছিল পাহারার দায়িত্বে। মুখ খুললে কিশোরীকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। এ দিন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে পুলিশকে সবই জানিয়েছে ওই ছাত্রী।
সব জেনে শিউরে উঠছেন গ্রামের মেয়ে-বউরা। বাড়ছে ভয়। সেই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন তাঁরা। গ্রামের দুই বধূ ঝর্না সাঁতরা এবং ঊর্বষী মণ্ডলের কথায়, “ এতদিন গ্রামে রয়েছি। কোনও দিন পুলিশের গাড়ি দেখিনি। চারদিকে শুধু ফাঁকা মাঠ। এমনিতেই গা ছমছম করে। এ বার আতঙ্ক আরও বেড়ে গেল।” গ্রামের বাসিন্দা ধনঞ্জয় মূলার বক্তব্য, “পাড়ার মেয়ের যারা এতবড় সবর্নাশ করল তাদের কঠোর শাস্তি না হলে গ্রামে আরও বড় ঘটনা ঘটবে। নিরাপত্তা বলে কিছুই নেই।”
ঘটনায় অভিযুক্ত সমর দাস ও স্বরূপ দাস দু’জনই বাইরে সোনার কাজ করে। মাস খানেক আগেই বিয়ে হয়েছে বছর ছাব্বিশের সমরের। সেই সূত্রে মাস চারেক আগে মুম্বই থেকে গ্রামে ফিরেছিল সে। আর বছর আঠারোর স্বরূপ মায়ের ক্যানসারের খবর পেয়ে গ্রামে এসেছে। গ্রামবাসী জানালেন, দু’জনের কেউই প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। মাঝেমধ্যে গ্রামে এলে মোটর বাইকে চেপে ঘুরে বেড়ায়। দিনের বেলাতেও মদ খেয়ে গ্রামের আটচালায় আড্ডা মারে। মুখে সব সময় গালিগালাজ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমরের এক বন্ধুর কথায়, “ আমরাও যে মদ খাই না বা আড্ডা মারি না, এমন নয়। কিন্তু পাড়ার বয়স্কদের দেখলে গুটিয়ে যাই। কিন্তু সমর কাউকে পরোয়া করত না। আর স্বরূপও সোনার কাজে হাতে কাঁচা টাকা পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।’’ তবে তারা যে এমন কাণ্ড ঘটাবে, কেউ ভাবতেই পারেনি।
নির্যাতিতা কিশোরীও তাই ভরসা করে সমর আর স্বরূপের মোটর বাইকে চেপে বসেছিল। রবিবার রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ ওই কিশোরীর খোঁজ শুরু করেন তাঁর পরিজন ও প্রতিবেশীরা। যে ক্লাবের তরফে জলসার আয়োজন করা হয়েছিল, সেই ক্লাবের ছেলেরাও মেয়েটির সন্ধানে বেরোয়। ক্লাব সম্পাদক গৌতম মাইতি বলেন, “রাত দশটা নাগাদ আমাদের ক্লাবের দুই সদস্যই প্রথমে আধ কিলোমিটার দূরে ওই মাঠের কাছে স্বরূপ ও সমরকে দেখতে পান। মেয়েটিও এখানেই ছিল।’’ পরে তিন জনকেই গ্রামে নিয়ে আসা হয়। কাউকে কিছু না জানিয়ে যাওয়ার জন্য ওই দুই যুবককে ধমক দেন গ্রামের লোকজন। বকাবকি করা হয় ওই কিশোরীকেও। কিন্তু মেয়েটি তখনও ধর্ষণের কথা জানায়নি। রাতে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুরু হয় রক্তক্ষরণ। এরপর ঘাটাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে বাবাকে ধর্ষণের কথা জানায় ওই ছাত্রী।
ঘটনা জানাজানি হতে গোটা গ্রাম চাইছে সমর আর স্বরূপের শাস্তি। ওই ছাত্রীর স্কুলের প্রধান শিক্ষক অতীশরঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, “আমরা সব শিক্ষক এবং স্কুলের সব পড়ুয়াও ছাত্রীটির পাশে আছি। আমরা চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। পুলিশকেও আর্জি জানিয়েছি।” এ দিন নির্যাতিতা ওই কিশোরীর বাড়িতে গিয়েছিলেন ঘাটালের তৃণমূল বিধায়ক শঙ্কর দোলই। রাজনীতি সরিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। অন্য দিকে, অভিযুক্ত স্বরূপের বাবা কাশীনাথ দাস বলেন, “আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করি। স্ত্রীর ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রচুর খরচ। ছেলে বাইরে কাজে যাওয়ায় ভেবেছিলাম কিছুটা সুরাহা হবে। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল!”
শুধু এই গ্রাম নয়, ঘাটাল শহর-সহ মহকুমাই স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের উদ্দেশে কটূক্তি আর অশালীন আচরণের অভিযোগ রয়েছে। যে গ্রামে ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার মনসাতলায় তো ‘বাইক রোমিওদের’ আড্ডা। ঘাটাল শহরের পাঁশকুড়া বাসস্ট্যান্ড, পুরনো এলআইসি মোড় সহ একাধিক অলিগলিতেও একই চিত্র। ভয়ে সন্ধের পরে মেয়েদের একা ছাড়তে ভয় পান বাবা-মায়েরা। ঘাটাল শহরের এক ব্যবসায়ীর কথায়, “মেয়ে রাতে টিউশনে গেলে কাজ ফেলে ওকে আনতে যেতে হয়।” ঘাটাল শহরের এক স্কুল শিক্ষিকার আবার অভিজ্ঞতা, “শুধু আমাদের মেয়েরা নয়, আমরাও সুরক্ষিত নই। সব ঘটনা তো পুলিশে জানানো যায় না। জানালে উল্টে বিপদ আমাদের।”
পুলিশ অবশ্য নজরদারি না থাকার অভিযোগ মানতে নারাজ। আর কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা প্রসঙ্গে পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষের বক্তব্য, ‘‘এক জনের সহযোগিতায় আর এক যুবক ধর্ষণ করেছে বলে মেয়েটি পুলিশকে জানিয়েছে। দু’জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে।’’