এক-দুই নয়, টানা ন’টা মাস! গর্ভস্থ ‘সন্তানকে ভাল রাখতে’ যাবতীয় নিয়ম তিনি মেনে চলেছেন। ছেলে-মেয়ে যাই হোক না কেন বেশ কয়েকটি নামও ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। প্রথম ‘সন্তান’ বলে বাড়িতে হইহইও বড় কম হয়নি। লোকাচার মেনে সাধভক্ষণ অনুষ্ঠানও হয়েছে। সেই তিনি, হোগলবেড়িয়ার বছর বাইশের মহিলা গত ২ ফেব্রুয়ারি করিমপুর গ্রামীণ হাসপাতালের লেবার রুমে এসে জানতে পারেন, তিনি গর্ভবতী নন। জরায়ুতে টিউমার রয়েছে। যা শুনে রীতিমতো ভেঙে পড়েন ওই মহিলা ও তাঁর স্বামী।
ওই মহিলার স্বামী বলছেন, ‘‘পরের দোকানে কাজ করে কোনও মতে সংসার চালাই। অভাবের সংসার। দিনের পর দিন ফি দিয়ে একজন নয়, দু’জন চিকিৎসকের কাছে স্ত্রীকে দেখাচ্ছি। কিন্তু তাঁরাও তো সমানে চিকিৎসা করে গেলেন। প্রসবের তারিখও লিখে দিলেন। এখন জানতে পারছি সে সব মিথ্যে ছিল। এ ভাবে আমাদের ঠকানোর মানে কী?’’ রবিবার ওই দম্পতি শুভেন্দু বিশ্বাস ও দিবাকর দত্ত নামে দু’জন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে লিখিত অভিযোগও জানিয়েছেন।
করিমপুর গ্রামীণ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ শিবময় সিংহ রায় বলছেন, ‘‘চিকিৎসা পরিভাষায় মহিলাদের এই রোগকে বলে ‘সিউডো সায়োসিস’। এমনটা হলে মহিলারা পেটের মধ্যে সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করেন। নিজেকে গর্ভবতী বলেও মনে করেন। এ ক্ষেত্রে ওই মহিলা যদি আগেই ইউএসজি করাতেন তাহলে এমন সমস্যা হত না। মহিলাকে পরীক্ষা করার পরে আমার সন্দেহ হয়। পরে ইউএসজি করে দেখা গিয়েছে মহিলার জরায়ুতে টিউমার হয়েছে। অস্ত্রোপচার করে সেটি বাদ দিলেই তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। তবে এমন ঘটনার পরে মহিলা তো বটেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন গোটা পরিবার।”
দিনকয়েক আগে প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছিল বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও। সেখানেও এক মহিলা লেবার রুমে গিয়ে জানতে পারেন যে, তিনি গর্ভবতী নন। ওই হাসপাতালের সুপার পঞ্চানন কুণ্ডুর ব্যাখ্যা, “ডাক্তারি পরিভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় ‘সিউডো প্রেগনেন্সি’। এই পরিস্থিতিতে মহিলারা নিজেকে গর্ভবতী বলেই মনে করেন। পেটের মধ্যে সন্তানের নড়ন চড়নও অনুভব করেন। এমনকী গর্ভবতীদের মতো পেট ফুলেও ওঠে। কিন্তু আদপে তাঁরা গর্ভবতী নন।”
হোগলবেড়িয়ার ওই মহিলার ‘সম্ভাব্য প্রসবের’ দিন ছিল ৪ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ২ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘প্রসব যন্ত্রণা’ নিয়ে করিমপুর হাসপাতালে আসেন। সেখানেই ওই মহিলাকে এমন নির্মম সত্যিটা মেনে নিতে হয়। ওই মহিলার স্বামীর অভিযোগ, বিষয়টি জানার পরে তিনি ফের ৩ ফেব্রুয়ারি বহরমপুরের চিকিৎসক দিবাকর দত্তের কাছে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে যান। তাঁর কথায়, ‘‘সে দিনও স্ত্রীকে পরীক্ষা করে গর্ভের বাচ্চা ভাল ও সুস্থ আছে বলে তিনি আশ্বাস দেন। পরে ইউএসজি-র রিপোর্ট দেখানোর পরে তিনি তাঁর ফি তিনশো টাকা ফিরিয়ে দেন। আর একজন চিকিৎসক, শুভেন্দুবাবুও তো বিষয়টি আমাদের আগেই বলতে পারতেন!’’
দিবাকরবাবুকে বহু বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএসেরও জবাব মেলেনি। আর শুভেন্দুবাবু বলছেন, ‘‘ওই দম্পতিকে আমি তো অনেক আগেই ইউএসজি করাতে বলেছিলাম। সেটা করিয়ে নিলেই সমস্যা হত না। ভুলটা আগেই ভেঙে যেত।’’ বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন দুই জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক তাপস রায় ও শুভাশিস সাহা।