অনেক দিন পর....। দিনহাটায় নিজের পুরনো বাড়িতে বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মহম্মদ এরশাদ। নিজস্ব চিত্র।
শহরটা তাঁকে চিনত ‘পেয়ারা’ নামে। বার্ধক্যে পৌঁছে, বাল্যের সেই দুপুর-বিকেলের স্মৃতি ছড়ানো শহরে ফিরে বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মহম্মদ এরশাদ বলছেন, ‘‘এখানে এলেই পুরনো দিন একেবারে ছেঁকে ধরে!’’
মঙ্গলবার, সেই ছোটবেলার দিনহাটায় এসে পুরনো স্মৃতি হাতড়ে রাস্তা-মাঠ পুরনো বাড়ির খোঁজ সেরে মধ্যাহ্নের আহারে বসে কূটনৈতিক চালও চেলে রাখলেন মধ্য-আশির প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি— ‘‘তিস্তার পানি সমস্যাটার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।’’ সেই সঙ্গে অবশ্য আশার কথাও শুনিয়ে রাখছেন। বলছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সহযোগিতাও চেয়েছি। উনি কথা দিয়েছেন সমাধানের একটা উপায় খুঁজে দেখার।’’
এ দিন দুপুরে চার দিনের সফরে কোচবিহারের দিনহাটার পৈতৃক বাড়িতে এসেছেন তিনি। সেখানে বসেই সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় মুখ্যমন্ত্রীকে তিস্তা সমস্যা নিয়ে নিজের লেখা গানের সিডি উপহার দিয়েছেন, সে কথা জানিয়ে রাখলেন এরশাদ। তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ সফরের সময় আমি নিজের লেখা একটি গানের সিডি উপহার দিয়েছিলাম মুখ্যমন্ত্রীকে। দেখি ওঁকে ফোন করা যেতে পারে। জানতে চাইব গানগুলো সুনেছেন কি না।’’ সে গানের দু’কলি শুনিয়েও রাখলেন—‘তিস্তা তোমার বুকের পরে গরুর গাড়ির চাকা ঘোরে’।
সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন বন উন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। রবীন্দ্রনাথবাবু তাঁকে জানান, তিস্তার উৎস ভুটানে জল কমে গিয়েছে। নদী বিশেষজ্ঞদের ওপর ওই ব্যাপারে একটি রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এরশাদ বলেন, “আমি আগে আলিপুরদুয়ারে গিয়েছিলাম। তখন সবাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলছিলেন। মনে হয় মমতা ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ।” তিস্তা ছাড়াও ছিটমহল সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি ভারত-বাংলাদেশ দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রাক্তন রাস্ট্রপতি বলেন, “ছিটমহলের মানুষের নিজস্ব বাসভূমি বলে কিছু ছিল না। কোনও জীবন ছিল না। তাঁরা মাতৃভূমি ফিরে পাওয়ায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।” সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ বলছেন, “প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হবে। তবে, অনেক টাকা বরাদ্দ হয়েছে শুনেছি। আশা করি সুষ্টু পুনর্বাসন হয়ে যাবে।”
দিনহাটা-গীতালদহ সড়ক ও রেল যোগাযোগ চালু-সহ দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও এ দিন জানিয়েছেন তিনি। এরশাদের সফরসঙ্গী বাংলাদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী গোলাম মহম্মদ কাদের বলেন, “গীতালদহ হয়ে যোগাযোগ চালুর ব্যাপারে একটি সমীক্ষাও হয়েছে।”
দিনহাটার পুরান বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পৈতৃক বাড়ি। ১৯৪৬ সালে দিনহাটা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তার পরেই রংপুরের কলেজে পড়তে চলে গিয়েছিলেন তিনি। দেশ ভাগ তার পরেই। আর নিজের ভিটেয় ফেরা হয়নি।
২০০৯ সালে শেষ বার দিনহাটায় এসেছিলেন তিনি। ছ-বছর পর পুরনো বাড়িতে এসে দৃশ্যতই আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন তিনি। ছোটবেলার বন্ধু পুঁটিমারি হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুধীর সাহার সঙ্গে খোশমেজাজে আড্ডায় মাতেন। শৈশবের খেলার সাথী থেকে সহপাঠীদের পরিবারের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেন। ঘরের ছেলের জন্য এ দিন তাঁর প্রিয় আড় মাছ, পাঁঠার মাংস, পোলাওয়ের ব্যবস্থা করেন বাড়ির লোকেরা। দেওয়া হয় পেয়ারার সরবত।
দিনহাটা থেকে এ বার ডুয়ার্সেও আসতে চলেছেন এরশাদ। আগামীকাল, বৃহস্পতিবার সব ঠিক থাকলে ডুয়ার্সের ধূপঝোরা মূর্তি লাগোয়া বাতাবাড়ি ক্লাব এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে আসার কথা তাঁর।