দক্ষিণ দিনাজপুর

ছোট খামারে ঘুঙরু শুয়োর পালনে লাভ

গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে বিশেষত আদিবাসী এলাকায় দেশি শুয়োর পালন চেনা ছবি। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে শুয়োর চাষ না করায় এদের রোগ সংক্রমণ প্রবণতা বেশি। উৎপাদনের হার কম। সব মিলিয়ে লাভ কিছু নেই, ক্ষতিটাই বেশি। উন্নত প্রথায় বিদেশি শুয়োর পালন করলে হয়তো লাভ হত।

Advertisement

সুকান্ত বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০১৬ ০০:১৩
Share:

গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে বিশেষত আদিবাসী এলাকায় দেশি শুয়োর পালন চেনা ছবি। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে শুয়োর চাষ না করায় এদের রোগ সংক্রমণ প্রবণতা বেশি। উৎপাদনের হার কম। সব মিলিয়ে লাভ কিছু নেই, ক্ষতিটাই বেশি। উন্নত প্রথায় বিদেশি শুয়োর পালন করলে হয়তো লাভ হত। কিন্তু অত খরচ করা গ্রামীণ আদিবাসীদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষিতে দক্ষিণ দিনাজপুর কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্র ওই জেলার বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে দেশি উন্নত প্রজাতির ঘুঙরু শুয়োর পালনে উৎসাহ দেয়। গত ৬-৭ বছরে দফায়-দফায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আড়াইশোরও বেশি আদিবাসী যুবককে স্বনির্ভরতার পথ দেখিয়েছে এই কেভিকে।

Advertisement

ঘুঙরু শুয়োর পশ্চিমবঙ্গের তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে জাত, দেশি, অধিক উৎপাদনশীল শুয়োর প্রজাতি। খোলা চত্বরে বা ছোট খামার করে এদের রাখা যায়। ৬-৭ মাসে এরা ৭০-৮০ কেজি ওজনের হয়। দ্রুত ওজন বাড়ে এদের। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। একবার গর্ভধারণে ১২-১৫টি বাচ্চা প্রসব হয়। যেখানে দেশি শুয়োর এক থেকে দেড় বছরে ৬০-৭০ কেজি হয় এবং প্রতি বার ৬-৭টি বাচ্চা প্রসব করে।

তবে, একেবারে খোলা চত্বরে এই শুয়োরদের না ছাড়াই ভাল। অর্ধ-মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে অর্থাৎ ছোট একটা থাকার জায়গার সঙ্গে লাগোয়া চত্বরে ঘুরে বেড়াক। থাকার জায়গার দেওয়াল হবে ৪ ফুট উঁচু। তার উপরে থাকবে ৪ ফুট তারজালি। মেঝে ইট, বালি-সিমেন্টের এবং ছাদ টিন, টালি বা খড়ের হতে পারে। ঘরে পর্যাপ্ত আলো-হাওয়া খেলা দরকার। নিকাশি ব্যবস্থা থাকতে হবে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক শুয়োরের দৈনিক ২০-২৫ লিটার জল দরকার। ঘর্মগ্রন্থি থাকে না শুয়োরদের। তাই ঘর ঠান্ডা থাকলে ভাল।

Advertisement

পরিত্যক্ত খাবার খেয়ে শুয়োর বাড়তে পারে। কিন্তু উন্নত প্রথায় শুয়োর পালন করতে চাইলে সুষম খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। বাদাম খোল, তিল খোল, মাছের গুঁড়ো, গম-ভুট্টা ভাঙা, গমের ভুষি, চালের কুড়ো, খুদ ইত্যাদি বয়স ভেদে বিভিন্ন ভাগে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। প্রজননযোগ্য অবস্থায় স্ত্রী শুয়োরকে দেড় কেজি ও পুরুষকে তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি সুষম খাবার দিতে হবে। প্রসূতিদের আড়াই থেকে তিন কেজি খাবার দিতে হবে। এর সঙ্গে মেশাতে হবে নির্দিষ্ট পরিমাণে খনিজ লবণ, খাদ্য লবণ, ভিটামিন। খাঁটি জাতের ঘুঙরু শুয়োর খুব দ্রুত বাড়ে এবং দেহে চর্বির পরিমাণ বেশি হয়। তাই যতটা সম্ভব তেলমুক্ত আমিষ প্রধান সুষম খাবারের জোগান ঠিক রাখা দরকার। অনথ্যায় তীব্র শারীরিক ধকল নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। সুষম খাবারের পিছনে খরচ কমাতে চাইলে ওল, কচু, কন্দ, খামালু, বিট, গাজর, কুমড়ো, শাক-সব্জি, পাতা, বরবটি, স্টাইলো, ভুট্টা, ওটস, সুবাবুল ইত্যাদি বাগানে চাষ করতে পারেন। এছাড়া টাটকা ভাতের মাড়, রান্না করা তরকারি, ছানার জল, হোটেলের উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি খাওয়ানো যেতে পারে।

শুয়োরের বাচ্চা জন্মানোর পরে নাভিরজ্জু জীবাণুমুক্ত উপায়ে কাটতে হবে এবং গাঁজলা দুধ খাওয়াতে হবে। দুধের অভাবে বা খাদ্যে আয়রনের অভাবে অনেক বাচ্চা মরে যায়। তাই প্রসবের পর এক লিটার জলে ৫০ গ্রাম ফেরাস সালফেট গুলে মা শুয়োরের বাঁটে লাগিয়ে দিতে হবে। বেশি বাচ্চা জন্মালে, দুধের অভাব হয়। সেই কারণে বাচ্চাদের ২-৩ সপ্তাহ পর ক্রিপ ফিডিং করানো জরুরি। সদ্যোজাতের চার জোড়া সুঁচ দাঁত দ্রুত ফরসেপ দিয়ে তুলে দিতে হবে। পুরুষ বাচ্চা ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে বার্ডিজো সাঁড়াশি পদ্ধতিতে খাসিকরণ করতে হবে। এতে শুয়োরের বৃদ্ধি ভাল হয় ও ভাল মাংস পাওয়া যায়।

রোগ-ব্যাধিটাই শুয়োর চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। পরিষ্কার থাকলে ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে রোগজ্বালা অনেক কম হয়। নিয়মিত টীকাকরণ, কৃমির ওষুধ খাওয়ানো জরুরি। দু’সপ্তাহে অন্তত এক দিন খামারঘর জল দিয়ে পরিষ্কার করে শুকনো করার পর ২-৩% ফরম্যালিন দ্রবণ স্প্রে করতে হবে। প্রজননের জন্য দুই থেকে তিন মাস বয়সের ঘুঙরু শুয়োরের ভাল চাহিদা। মাংসের জন্য ছ’মাস বয়সে বিক্রি করলে লাভ বেশি। কারণ এই বয়সের পর শুয়োরের ওজন খুব একটা বাড়ে না, সেই অনুপাতে খায় বেশি। লেখক দক্ষিণ দিনাজপুর কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement