চা বলয়ে প্রভাব বাড়াতে স্থান নির্বাচন

ছোট মাঠে সভা মমতার, যানজটে দুর্ভোগ

প্রশাসন বনাম রাজনীতির লড়াইয়ে ফের জয়ী হল রাজনীতিই। অন্তত, বুধবার মালবাজারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক সভার জেরে জাতীয় সড়ক প্রায় চার ঘণ্টা অবরূদ্ধ থাকায় এমনই অভিযোগ করছেন বিরোধীরা। কারণ, ওই সভার জেরে বেলা বারোটা থেকে চারটে পর্যন্ত ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক প্রায় অচল হয়ে যায়।

Advertisement

কিশোর সাহা ও রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০১৫ ০৪:০৬
Share:

মালবাজারের সভামঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার ছবিটি তুলেছেন দীপঙ্কর ঘটক।

প্রশাসন বনাম রাজনীতির লড়াইয়ে ফের জয়ী হল রাজনীতিই। অন্তত, বুধবার মালবাজারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক সভার জেরে জাতীয় সড়ক প্রায় চার ঘণ্টা অবরূদ্ধ থাকায় এমনই অভিযোগ করছেন বিরোধীরা। কারণ, ওই সভার জেরে বেলা বারোটা থেকে চারটে পর্যন্ত ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক প্রায় অচল হয়ে যায়। সভাস্থল থেকে এক দিকে চালসা, অন্য দিকে নিউ মাল পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার রাস্তা সভামুখী জনতার দখলে চলে যায়। সভাস্থলে তিলধারণেরও জায়গা ছিল না। প্রশাসনের একাংশের দাবি, এতটা ভিড় হবে, তা আগে আঁচ করা যায়নি। যদিও, বিরোধীদের দাবি, বিধানসভা ভোটের আগে ছোট মাঠে সভা করে তা ভিড়ে ঠাসা দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়। যদিও, তৃণমূলের জেলা সভাপতি সৌরভ চক্রবর্তীর দাবি, স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এ দিন বাসিন্দারা সভায় এসেছেন। কোনও কৌশলের প্রয়োজন হয়নি বলে দাবি জেলা তৃণমূল সভাপতির।

Advertisement

সভার শেষে ভিড় ঠেলে দু’কিলোমিটার হেঁটে মুখ্যমন্ত্রীকে হেলিপ্যাডে ফিরতে হয়। এ দিনের সভার মাঠ যে ছোট হয়েছে, তা বক্তব্যের শুরুতে নিজেই জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। মাঠে সকলের জায়গা না হওয়ার জন্য, সকলের কাছে ‘ক্ষমা’ও চেয়ে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাতেই বিরোধীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, এমন ছোট মাঠ কেন মুখ্যমন্ত্রীর সভার জন্য বেছে নেওয়া হল? বিশেষ করে যে সভায় সরকারি প্রকল্পের সুযোগ সুবিধে বিলি করা হবে, সেখানে ভিড় যে হবেই, তা প্রশাসনের আগেই আঁচ করা উচিত ছিল বলে দাবি তাঁদের। তবে কেন বাছা হল এই জায়গা?

মালবাজারের পরিমল মিত্র কলেজের মাঠকে মুখ্যমন্ত্রীর সভার জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক অঙ্ক কাজ করেছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। মালবাজার ছাড়াও, নাগরাকাটা এবং ময়নাগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রকে লক্ষ করেই সভাস্থল বাছা হয় বলে অভিযোগ। মালবাজার এবং নাগরাকাটা দুই বিধানসভা কেন্দ্রের ফলাফলই চা বলয়ের ভোটের উপর নির্ভরশীল বলে ডান-বাম সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই দাবি করেন। গত লোকসভা ভোটে চা বাগানের বাম ভোটে ক্ষয় হওয়াতেই তৃণমূলের উত্থান হয় বলে মনে করা হয়। বিরোধী থাকাকালীন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার বন্ধ চা বাগানে এসেছিলেন। হাতিয়ার করার চেষ্টা করেছিলেন শ্রমিকদের অভাব-অভিযোগকে। যদিও, গত বিধানসভা ভোটে মালবাজার, ময়নাগুড়ি লাগোয়া ধূপগুড়ি তিনটি আসনেই তৃণমূল জোটের প্রার্থীরা পরাজিত হয়। একমাত্র নাগরাকাটায় কংগ্রেস প্রার্থী জেতেন। যদিও, পরবর্তীতে মালবাজার বাম বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দান করেন। ময়নাগুড়ি বিধানসভায় উপ নির্বাচনে তৃণমূল জেতে। দলের অন্দরের খবর আগামী বিধানসভা ভোটে মালবাজার এবং নাগরাকাটা বিধানসভা ‘দখলে’ই চা বলয়কে লক্ষ্য বাছা হয়েছে। সেই সঙ্গে বন্ধ চা বাগানগুলিতে শ্রমিক মৃত্যু বা অভাব-অনটন নিয়ে বিরোধীদের ক্রমাগত অভিযোগের পাল্টা বার্তা দিতেও এ দিন সভার জন্য মালবাজারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং সভাস্থল হিসেবে বাছা হয় চা বাগানের কোলে জাতীয় সড়কের পাশের মাঠকে। চালসা, মেটেলি, নাগরাকাটার বিভিন্ন চা বাগান থেকে পরিমল মিত্র কলেজের মাঠ অনেকটাই কাছে। এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর মিনিট চল্লিশের বক্তব্যে বারবারই ঘুরে এসেছে বন্ধ চা বাগানের প্রসঙ্গ। বাংলাতেই বক্তব্য রাখলেও, চা শ্রমিকদের পাশে থাকার বার্তাও দিতে মুখ্যমন্ত্রী হিন্দিতে বলেন, ‘‘হাম আপলোগকে সাথ হ্যায়।’’

Advertisement

বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সভায় রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ বাসিন্দাদের। এ দিন দুপুর ১টা থেকে অন্তত তিন ঘণ্টা ভিড়ের চাপে জাতীয় সড়কের ওই এলাকায় যান চলাচল স্তব্ধ হয়েছিল বলে অভিযোগ। যার জেরে ভুগতে হয়েছে, নিত্যযাত্রী থেকে দুরপাল্লার বাসযাত্রী এমনকী পর্যটকদেরও। এ দিন সভা শুরুর সময় ছিল দুপুর ১টা। তার ঘণ্টাখানেক আগেই কলেজ মাঠ লাগোয়া জাতীয় সড়কের দু’পাশে দড়ি দিয়ে ‘কর্ডন’ করে দেয় পুলিশ। যান চলাচলের গতি সে সময় থেকেই স্লথ করে দেওয়া হয়। মাল নদীর পাশে সেনা ছাউনিতে মুখ্যমন্ত্রীর হেলিকপ্টার নামে ১টা বেজে পনেরো মিনিট নাগাদ। সেখান থেকে কিলোমিটার খানেক দূরের পরিমল মিত্র কলেজ মাঠে গাড়িতে জাতীয় সড়ক ধরেই পৌঁছয় মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়। মুখ্যমন্ত্রীর হেলিকপ্টার মাটি ছুঁতেই জাতীয় সড়কে যান চলাচল একমুখী করে দেয় পুলিশ। এরপর সভা শুরু হতেই, ভিড় মাঠ ছাড়িয়ে জাতীয় সড়কের উপর উঠে আসে। প্রায় ঘণ্টা খানেক সভা চলাকালীন জাতীয় সড়কে ভিড় দাঁড়িয়ে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী সভাস্থল ছেড়ে যাওয়ার পরেও ভিড়ের চাপে অন্তত দেড় ঘণ্টা জাতীয় সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। পণ্য বোঝাই লরি, যাত্রী বোঝাই বাস থেকে শুরু করে পর্যটক ঠাসা ছোট গাড়িও জটে থমকে থাকতে দেখা গিয়েছে। পরিমল মিত্র কলেজ লাগোয়া জাতীয় সড়কের জট ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে দু’দিকে। থেমে থাকা গাড়ির লাইন একদিকে চালসা এবং এক সময়ে উল্টোদিকে ওদলাবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ। যদিও পুলিসের দাবি, কোনও সময়েই জাতীয় সড়কে যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়নি। ভিড়ের চাপ থাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, তাতেই যান চলাচলের গতি কমে যায় বলে পুলিশের দাবি।

জলপাইগুড়ির জেলাশাসক পৃথা সরকার অবশ্য বলেন, ‘‘মাঠ ভরবে ভেবেছিলাম। কিন্তু ভিড় যে রাস্তাতেও ছড়িয়ে যাবে, তা বোঝা যায়নি।’’

যানজটে ভুগতে হয়েছে ব্যবসায়ীদেরও। লাগোয়া বিভিন্ন জনপদ থেকে প্রতিদিনই বাসিন্দারা মালবাজারে বাজার করতে আসেন। এ দিন যানজটের চাপে ক্রেতাদের অনেকেই শহরে ঢুকতে পারেননি। মালবাজার পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান তথা ব্যবসায়ী সুপ্রতিম সরকারের অভিযোগ, ‘‘যানজটে জাতীয় সড়ক থমকে থাকায়, ব্যবসার তো যা ক্ষতি হওয়ার হলই, বিপদে পড়লেন পর্যটকরাও। শীতের সময়ে এখন ডুয়ার্স পর্যটক ঠাসা। অনেকেরই ট্রেন এবং বিমান ধরার তাড়া থাকে। যানজটে তাদের যে ভোগান্তি হল, তার দায় কে নেবে?’’ সিপিএমের মালবাজারের জোনাল সম্পাদক চানু দে-র অভিয়োগ, ‘‘সরকারি টাকায় রাজনৈতিক সভা করা হয়েছে।’’ জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূল সভাপতি সৌরভবাবুর দাবি, ‘‘বাম আমলে ডুয়ার্সের কোনও উন্নয়নই হয়নি। এখন মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে সর্ব স্তরের মানুষকে উন্নয়নে সামিল করেছেন, তাতেই স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া মিলেছে।’’

গত মঙ্গলবারই আলিপুরদুয়ারের সরকারি সভা থেকে চা বাগান মালিকদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা দিয়েছিলেন, ‘‘বাগান চালাতে না পারলে ছেড়ে দিন।’’ রাজ্য সরকার সেই বাগান চালাবে বলে সভায় জানিয়েছিলেন তিনি। এ দিন বুধবার মালবাজারের সভা থেকেও মুখ্যমন্ত্রী একই বার্তা শুনিয়েছেন। এ দিন সুর আরও একধাপ চড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘অসৎ মালিক, যাঁরা শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা জমা দেয়নি, বাগান বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের বলব বাগান আমাদের দিয়ে দাও। যে বাগান চালাতে পারবে, আমরা তাকে দিয়ে দেব।’’ সেই সঙ্গে চা বাগানের শ্রমিকদের বলেছেন, ‘‘আপনারা ভাববেন না, রাজ্য সরকার আপনাদের পাশে আছি। মজদুর ভাই আচ্ছা থাক, এটাই আমি চাই।’’ মালবাজারের সভায়, মুখ্যমন্ত্রী বক্তব্যে জলপাইগুড়ি জেলার উন্নয়নের ফিরিস্তি যেমন শোনা গিয়েছে, তেমনই বন্ধ বাগানগুলির প্রবীণ শ্রমিকদের রাজ্য সরকারের তরফে ৫ কেজি চাল, ৩ কেজি গম এবং ৫ লিটার কেরোসিন তেল দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে চালসা থেকে মংপং পর্যন্ত রাস্তা চওড়া করা সহ জলপাইগুড়ি করলা নদীর উন্নয়ন, সার্কিট বেঞ্চের পরিকাঠামো তৈরির কাজ দ্রুত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ দিনের সভায় পড়ুয়াদের সাইকেল বিলি করা হয়। ‘ট্যুরিস্ট পুলিশে’র কাজও এ দিন থেকে সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement