জোটবার্তা পেতেই চনমনে ময়দান

সিপিএমের নিচুতলা প্রবল ভাবে চাইছিল। তারা তা জানিয়েও দিয়েছিল উপরতলাকে। কংগ্রেসের একটা ছোট অংশ দোলাচলে ভুগলেও বেশির ভাগ নেতাকর্মীই চাইছিলেন, জোট হোক।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:৫০
Share:

সিপিএমের নিচুতলা প্রবল ভাবে চাইছিল। তারা তা জানিয়েও দিয়েছিল উপরতলাকে।

Advertisement

কংগ্রেসের একটা ছোট অংশ দোলাচলে ভুগলেও বেশির ভাগ নেতাকর্মীই চাইছিলেন, জোট হোক।

বৃহস্পতিবার এ কে গোপালন ভবন থেকে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পরে কংগ্রেসের সমঝোতার বার্তা বাইরে আসতেই নতুন করে আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছেন দুই দলের কর্মীরা।

Advertisement

গত লোকসভা নির্বাচনে গোটা রাজ্যে এই নদিয়া জেলাতেই সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো ফল করেছিল বিজেপি। কিন্তু সেই ফলের ধারে-কাছেও যে তারা এ বার যেতে পারবে না, তা প্রায় পরিষ্কার। বরং তাদের দখলে থাকা বাড়তি ভোট ফিরবে অন্য দলের ভোটব্যাঙ্কে। পাটিগণিতের অঙ্ক বলছে, ওই ভোটের বেশির ভাগটাই গিয়েছিল বামেদের থেকে। কংগ্রেসের থেকেও কিছুটা। তা যদি এক ঠিকানায় ফেরে, তবে কিন্তু জোড়াফুলের ব্যথা আছে।

গত লোকসভা ভোটের হিসেব বলছে, সিপিএম-কংগ্রেস মিলিত ভোটের সঙ্গে সম্ভাব্য বিজেপি-ফেরত (যা গত বিধানসভা ভোটের চেয়ে লোকসভা ভোটে বাড়তি পেয়েছিল) ভোটের দুই-তৃতীয়াংশও যদি যোগ হয়, তা হলে এমনকী ১০টি আসনও পেয়ে যেতে পারে জোট। করিমপুর, তেহট্ট, পলাশিপাড়া, কালীগঞ্জ, চাপড়া, নাকাশিপাড়া, কৃষ্ণনগর (দক্ষিণ), শান্তিপুর, রানাঘাট (দক্ষিণ) ও হরিণঘাটা— বিজেপি-ফেরত বাকি এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেলেও এই দশ আসনে হারতে পারে তৃণমূল। আবার কৃষ্ণনগর উত্তর বা রানাঘাট উত্তর-পশ্চিমেও হা়ড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

নদিয়া জেলায় এ বার প্রায় চল্লিশ লক্ষ ভোটার, যার প্রায় ৮৫% ভোট দিতে যাবেন, এমনই প্রত্যাশিত। গত লোকসভা ভোটে তৃণমূল পেয়েছিল ৪০% ভোট, বামেরা প্রায় ৩০%, কংগ্রেস প্রায় সাত শতাংশ, বিজেপি ২১ শতাংশ। মোদী হাওয়ায় লাফিয়ে বেড়েছিল বিজেপির ভোট। ২০১১-র বিধানসভা ভোটের যা ছিল মোটে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিজেপি শিবির ঠারেঠোরে কবুল করছে, ২১ শতাংশ ভোট তারা আদৌ ধরে রাখতে পারবে না। এবং সকলেই চেয়ে আছে সেই অঙ্কের দিকে।

কেননা, বিজেপির ভোট অক্ষত থাকলে শুধু জোটের দৌলতেই অন্তত পাঁচটা আসন— কালীগঞ্জ, চাপড়া, কৃষ্ণনগর (দক্ষিণ), শান্তিপুর ও রানাঘাট (দক্ষিণ) হাতছাড়া হতে পারে তৃণমূলের। গত বিধানসভা ভোটে দু’টি আসন, করিমপুর ও পলাশিপাড়া সিপিএম নিজের দখলে রেখেছিল। লোকসভা ভোটেও তা-ই। এ বার কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের জোট হলে লোকসভা ভোটের নিরিখে ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি ভোট তাদের মিলিত ভাবে পাওয়ার কথা।

এখন কথা হল, বিজেপির ভোট তো অক্ষত থাকছে না। তা হলে বিজেপি-ফেরত ১৫% থেকে ১৬% ভোট কাদের মধ্যে ভাগাভাগি হবে? সিপিএমের দাবি, জোট হলে জেলার উত্তরে তারা যথেষ্ট ভাল ফল করবে। বিশেষ করে করিমপুর, তেহট্ট, পলাশিপাড়া, চাপড়া, কালীগঞ্জ ও নাকাশিপাড়ায় জেতার ব্যাপারে তারা আত্মবিশ্বাসী। ২০১৩-র পঞ্চায়েত ভোটে ওই সব এলাকায় তৃণমূলকে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছিল বামেরা। শান্তিপুর, রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম, রানাঘাট দক্ষিণ ও কল্যাণীতে কিছু আসনে সমানে-সমানে টক্কর হবে বলেও তারা মনে করছে। এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের গোষ্ঠীবাজি বাড়তি সুবিধা দেবে বলে সিপিএম নেতাদের আশা।

এর বাইরে বিজেপি-ফেরত ভোট তাঁরাই বেশি পাবেন বলেও সিপিএম নেতাদের ধারণা। তাঁদের ব্যাখ্যা, গত লোকসভা ভোটে তৃণমূলের বিশেষ ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বরং তৃণমূল বিরোধী ভোটই বিজেপির ভাঁড়ারে জমা হয়েছিল। ক্ষতি বেশি হয়েছিল বামেদের, কিছুটা কংগ্রেসেরও। এখন ওই ‘তৃণমূল-বিরোধী’ ভোট ফিরে তাঁদের দিকেই আসবে বলে সিপিএম নেতারা আশা করছেন।

ভোট ভাল বোঝেন এমন বিজেপি নেতারাও মানছেন, মূলত সিপিএমের ভাত মেরে তাঁদের ভোটব্যাঙ্ক ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। সিপিএমের ভোটের একটা অংশ ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তৃণমূলও। সেই অংশ যদি এ বার না-ও ফেরে, জোট হলে সিপিএমের ভোট সিপিএমে ফিরে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। কংগ্রেস নেতাদের একাংশ আবার আশা করছেন, শুধু বিজেপি নয়, তৃণমূল থেকেও কর্মীরা তাঁদের দিকে ফিরে আসবেন। কেননা তাঁরা তৃণমূলে গিয়ে অপমানিতই হয়েছে‌ন। এদের মধ্যে অনেক পুরনো তৃণমূল কর্মীও আছেন।

তৃণমূলও মানছে, জেলার উত্তরে লড়াইটা কঠিন। তবে তাদের একটিই পাল্টা যুক্তি। তা হল, লোকসভা ভোটের পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। কংগ্রেস এবং সিপিএম ভেঙে আরও বহু কর্মী তাদের দিকে ভিড়েছেন। ফলে এই সব হিসেব কষা অর্থহীন। বরং সিপিএম এবং কংগ্রেসর উপরে আস্থা হারিয়ে বিজেপির মধ্যে যাঁরা বিকল্প শক্তি খুঁজেছিলেন, তাঁরাও যে উন্নয়নের প্রশ্নে শাসকদলের সঙ্গে আসছেন, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক পুর ও উপনির্বাচন। যার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির ভোট কমলেও তা সিপিএমের ভোট বাড়ায়নি। বরং ভোট বেড়েছে তৃণমূলের।

যে কারণে জেলা তৃণমূল সভাপতি গৌরীশঙ্কর দত্ত এখনও হুঙ্কার দিচ্ছেন, ‘‘এই সব জোট-ঘোঁট নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। আমাদের জয়ের মার্জিন আরও কত বাড়বে, সেটাই বরং ভাবছি।’’ বেকায়দায় পড়লে প্রতি-আক্রমণই পিঠ বাঁচানোর সেরা উপায়— কে না জানে!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement