থানার ঘরে ছোটা ভীম, স্যুইস-পথে শিলিগুড়ি

সুইৎজারল্যান্ড থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব অনেক। তবে, ‘স্যুইস পুলিশ’-এর পথেই যেন হাঁটল শিলিগুড়ি পুলিশ। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুইস পুলিশের ‘শিশু-মিত্র’ হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। সেখানে কোনও অপরাধের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে শিশুদের থানায় নিয়ে যাওয়া হলেও, তাদের ধারেকাছে কোনও পুলিশ অফিসারকে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না।

Advertisement

অনির্বাণ রায়

শেষ আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:৫৪
Share:

শিলিগুড়ি থানায় শিশুবান্ধব সেল চালু হল। বুধবার তোলা নিজস্ব চিত্র।

সুইৎজারল্যান্ড থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব অনেক। তবে, ‘স্যুইস পুলিশ’-এর পথেই যেন হাঁটল শিলিগুড়ি পুলিশ। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুইস পুলিশের ‘শিশু-মিত্র’ হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। সেখানে কোনও অপরাধের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে শিশুদের থানায় নিয়ে যাওয়া হলেও, তাদের ধারেকাছে কোনও পুলিশ অফিসারকে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। থানার পাশে যে ঘরে শিশুকে রাখা হয়, সেখানে সম্প্রতি ‘ভিডিও গেম’ খেলার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সে সব শিশুর সঙ্গে কথা বলেন মনোরোগ নিয়ে পড়াশোনা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। পুলিশ কর্তারা শুধুমাত্র সেই কথোপকথনের ভিডিও রেকর্ডিং দেখেন। বুধবার শিলিগুড়ি থানাতেও উদ্বোধন হয়েছে শিশুবান্ধব কেন্দ্রের। অভিযুক্ত অথবা উদ্ধার হওয়া শিশুদের থানায় আনা হলে, রাখা হবে এই কেন্দ্রে। ঘরের চার দেওয়ালে কার্টুন চরিত্রের নানা ছবি। শিশুর সামনে যাবেন না কোনও উর্দিধারী পুলিশ কর্মী। কথা বলবেন সাধারণ পোশাকে থাকা মহিলা পুলিশ কর্মীরা।

Advertisement

উত্তরবঙ্গে থানায় পুলিশ বান্ধব কেন্দ্র অবশ্য এই প্রথম নয়। দার্জিলিঙের মিরিক এবং আলিপুরদুয়ার জেলার দু’টি থানাতেও এই কেন্দ্র রয়েছে। তবে শিলিগুড়ি থানায় শিশুদের বিষয় দেখভালের জন্য পুলিশ কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা শিশুদের কাউন্সেলিংও করবেন। সেই সঙ্গে দিন-রাতের সবসময়েই কেন্দ্রটি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিলিগুড়ি পুলিশ। গভীর রাতেও কোনও শিশুকে থানায় নিয়ে আসা হলে, হাজতের পাশে বা ডিউটি অফিসারের ঘরের সামনে থাকা বেঞ্চে বসানো হবে না। রাখা হবে চার দেওয়ালে কার্টুন চরিত্রদের ছবি আঁকা ঘরে। সে সব জেনেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মকর্তাদের দাবি, শিশুদের প্রতি সংবেদনশীলতায় স্যুইস পুলিশের সঙ্গে এ বিষয়ে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে শিলিগুড়ি পুলিশেরও।

শিলিগুড়ি থানায় এ দিন শিশু বান্ধব কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেছেন এডিসিপি মৃণাল মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন এসিপি (পূর্ব) পিনাকী মজুমদারও। এ দিন উদ্বোধনের আগে শিলিগুড়ি থানার আইসি অচিন্ত্য গুপ্ত জানিয়েছেন, শিশু বান্ধব কেন্দ্র চালাতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। সংস্থার কাউন্সিলররাও নিয়মিত পুলিশকে পরামর্শ দেবেন। শিলিগুড়ি পুলিশের এডিসিপি মৃণালবাবু বলেন, ‘‘অভিযুক্ত হোক বা নির্যাতনের শিকার, এ বার থেকে কোনও শিশুকেই থানায় এসে উর্দিধারীদের সামনে পড়তে হবে না। আলাদা ঘরে রেখে, তাদের সঙ্গে খোলামেলা পরিবেশে কথা বলবেন বিশেষ প্রশিক্ষিত মহিলা পুলিশ কর্মীরা। শিশুরা বুঝতেই পারবেন না তাঁরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন।’’

Advertisement

বুধবার শীতের সন্ধ্যায় শিলিগুড়ি থানার পাশ দিয়ে যাতায়াত করা পথচারীরা খানিকটা অবাকই হয়েছিলেন। থানার গেট বেলুন দিয়ে সাজানো। গেট পার হতেই রঙিন প্লাই-কাঁচ দিয়ে তৈরি হয়েছে ঘর। ঘরের দেওয়ালের ছবিতে বন্ধুদের সঙ্গে ছোটা ভীম, পক্ষীরাজে চড়ে রাজপুত্র। আকাশ, সূর্য, পাখির ছবি। বেলুন দিয়ে সাজানো ঘর। সকলেই বলেছিলেন, থানার ঘরের দেওয়াল এমনও হয়! এই ঘরেই রাখা হবে থানায় আনা শিশুদের। প্রথমে প্রশিক্ষিত মহিলা পুলিশকর্মীরা শিশুটির সঙ্গে কথা বলবেন। কমিকসের বইয়ের ছবি দেখানো হবে, মন ভাল থাকে এমন গল্পও করা হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্য ক্ষেত্রে অভিযুক্ত বা উদ্ধার হয়ে আসা শিশুদের থানায় নিয়ে আসার পরে শিশুকল্যাণ সমিতিকে খবর পাঠানো হয়। সমিতির নির্দেশে থানা থেকে হোমে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিশুদের থানাতেই রাখা হয়। বেশির ভাগ সময়েই থানার পরিবেশ, কথোপকথন শিশুমনে প্রভাব ফেলে বলে সমাজকর্মীদের অভিযোগ। এমনকী উর্দিধারী পুলিশ কর্মীরা কথা বলতে এলে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসা শিশুরাও নিজেদের ‘অপরাধী’ মনে করতে শুরু করে বলে দাবি।

শিলিগুড়ি থানার কেন্দ্রটি গড়ে দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সিনি। সংস্থার কো-অর্ডিনেটর শেখর সাহা বলেন, ‘‘থানায় কয়েক ঘণ্টা কাটালেও শিশুমনে তার গভীর প্রভাব পড়ে। সে কারণে উন্নত দেশগুলিতে থানাতেই শিশুদের জন্য এমন কেন্দ্র রয়েছে যাতে শিশুমনে কোনও প্রভাব না পড়ে। সেই উদ্যোগ শুরু হয়েছে। শিলিগুড়ি থানার কেন্দ্রটি সর্বক্ষণ খোলা থাকবে এবং মহিলা পুলিশ কর্মীদের কাউন্সিলরের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এটা অভিনব।’’ এ দিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হোমে থাকা শিশু-কিশোররা নাচ গানের অনুষ্ঠানও করেছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement