একটি ফুল বাজারের ছবি। —ফাইল চিত্র।
মায়ের পায়ে ওঠার জন্য হন্যে জবা। তার চেয়েও বেশি হন্যে মায়ের ভক্তেরা। কিন্তু তার জন্য যা মাসুল দিতে হল, তাতে পুজোর উদ্যোক্তা মাত্রেই গলদঘর্ম।
কালীপুজোর দিন সকালেও যে রক্তজবার দাম দুর্গাপুরের বাজারে ছিল দেড়-দু’টাকা, বেলা বাড়তেই তা হয়েছে তিন টাকা। বিকেলে এমনকী ৫ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে। জবা ফুলের বড় মালার দাম ছিল প্রায় ১০০ টাকা। দুপুরে সেই মালাই দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। শিলিগুড়ির বাজারে ১০৮টা জবার মালা ৩০০ টাকা, ফুল ৩ টাকা করে। মোদ্দা কথা, উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ, যে যেখানে যেমন পেরেছে দাম নিয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে মল্লিকঘাট, শিয়ালদহ, কোলাঘাট সর্বত্রই লাল জবা বিক্রি হয়েছে ১২০০ টাকা প্রতি হাজার হিসাবে। আগের দু’দিন দর যাচ্ছিল ৮০০ টাকা হাজার। সপ্তাহ খানেক আগেও পাইকারি ফুলের বাজারে একশো টাকায় এক হাজার জবা পাওয়া যেত। সেই দাম এক লাফে কয়েক গুণ হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, খুচরো বাজারেও দাম চড়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুরে হলদিয়া দুর্গাচক, সুতাহাটা এলাকায় ১০৮টি জবা দিয়ে তৈরি মালা বিকিয়েছে ১০০-১৫০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে যার দাম ছিল ৪০-৫০ টাকা। হুগলির পান্ডুয়ার তেলিপাড়ায় এমনি দিনে ১০৮টি জবা ফুলের মালা বিক্রি হয় ২০-৩০ টাকায়। এ দিন তা বিকিয়েছে ৫০-৬০ টাকায়, ১০০১টি জবার মালা ৫০০ টাকায়। শ্রীরামপুরেও তা-ই।
উত্তরবঙ্গের অনেক জায়গায় টান পড়েছে জোগানেই। মালদহের চাঁচল থেকে জলপাইগুড়ির মালবাজার, সব জায়গাতেই জবার জন্য সকাল থেকে দৌড়াদৌড়ি করে বেরিয়েছেন পুজোর উদ্যোক্তারা। কলকাতা থেকে কিছু জবা এলেও তা প্রায় শুকনো। সেই ফুলই এক-একটি দু’টাকায় বিক্রি হয়েছে। চাঁচলের ফুল বিক্রেতা জগত স্বর্ণকার বলেন, ‘‘এ দিকে জবাফুল হয় না বললেই চলে। কলকাতা থেকে কিছু ফুল নিয়ে এসেছিলাম। তা-ই বিক্রি হচ্ছে।’’ আসল ফুল না মেলায় এমনকী প্লাস্টিকের জবার মালাও বিক্রি হয়েছে মালদহে।
উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে কিছু জবার ফলন হয়। কিন্তু গরম ও বৃষ্টিপাতের অভাবে এ বার তেমন হয়নি। সেখানে ফুল ও মালা পৌঁছেছে কলকাতা থেকে। মালার দাম প্রতিটি ১৫ থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে। ফোটা জবাফুল না পেয়ে অনেক উদ্যোক্তা ওই মালা কিনেই কাজ চালিয়েছেন। কোচবিহারেও তা-ই। ১০৮টা লাল জবার মালার দাম ছিল ১৫০-২০০ টাকা। হাওড়া থেকে আসা ফুল জলপাইগুড়িতে বিক্রি হয়েছে দু’টি ৫ টাকা দরে। লঙ্কা জবা পাঁচটি ৩ টাকা। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে একটি জবারই দাম উঠেছিল ৫ টাকায়, ১০৮টার মালা ৪৫০-৫০০ টাকা।
প্রতি বছরই কালীপুজোর এক সপ্তাহ আগে থেকে লাল জবার দাম চড়তে থাকে। তবে এ বছর পুজোর দিনে যে ভাবে দাম বেড়েছে তা গত কয়েক বছরে হয়নি। আগে কয়েক বছর পুজোর দিনে জবা বিক্রি হয় ৭০০-৮০০ টাকা হাজারে। এ বারে তা এক লাফে ১২০০ টাকায় চলে গেল কেন?
সারা বাংলা ফুল চাষি ও ফুল ব্যবসায়ী সমিটির সম্পাদক নারায়ণ নায়েকের ব্যাখ্যা, এ বছর ব্যাপক বর্ষণের জেরে জবার ফলনের ক্ষতি হয়েছে। কালীপুজোর জন্য এক সপ্তাহ আগে থেকে চাষিদের থেকে জবাফুল কিনে ব্যবসায়ীরা হিমঘরে রেখেছেন। তবে চাষিরা বলছেন, আসল ধাক্কাটা লেগেছে গত দু’দিনের নতুন শীতে।
ফুলচাষিদের ব্যাখ্যা, গত দু’দিন ধরে ঠান্ডা পড়ায় জবার ফলন হঠাৎ কমে গিয়েছে। হাওড়ার বাগনানের বাঁকুড়দহ গ্রামের চাষি পুলক ধাড়া বলেন, ‘‘গত কয়েক দিন ধরে রোজ ভোরে ১০ হাজার করে জবা ফুল তুলছিলাম। এ দিন সকালে ৭ হাজার পেয়েছি। আচমকা ঠান্ডা পড়াতেই ফলন কমে গিয়েছে।’’ নদিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর ২৪ পরগনা এবং হাওড়া জেলাতেই ফুলের চাষ হয় বেশি। সর্বত্রই এক অবস্থা।
জবা ছাড়াও গাঁদা ও পদ্মের চাহিদা থাকে কালীপুজো এবং দেওয়ালিতে। দাম বেড়েছে ওই দুই ফুলেরও। দু’টাকার পদ্ম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিটি ১৫-১৮ টাকায়। কুড়িটি বাসন্তী গাঁদা ২০০ টাকায়। ঝুরো রজনীগন্ধা বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা কেজি দরে, এক সপ্তাহ আগেও যা ১০০ টাকা ছিল। রজনীগন্ধার স্টিক ১০ টাকা, একটা গোলাপও ১০ টাকা।
জলপাইগুড়িতে গাঁদা ফুলের মালা ১০ টাকা, একটি গোলাপ ৩ টাকা, একটি রজনীগন্ধা ১৫ টাকা। নদিয়ায় পদ্ম ১০-১২ টাকা, গাঁদা ফুলের মালা ৩-৫ টাকা, অপরাজিতা ফুল ২৫০-৩০০ টাকা কিলো দরে বিক্রি হয়েছে। কৃষ্ণনগরের ফুল ব্যবসায়ী যুগল দত্ত জানান, ‘‘গাঁদার ফলন ভাল হওয়ায় দর অপেক্ষাকৃত কম। তবে পুজোয় যা বাকি ফুল লাগে, তার দর বেশ চড়া।’’ মালদহে গাঁদার মালা ছিল ১০ টাকা, পদ্ম ১০ টাকা, ১০০ গ্রাম সাদা ফুলও ১০ টাকা। ১০০টি বেলপাতা পাঁচ থেকে সাত টাকা। শ্রীরামপুরে ৩৬টি গাঁদার মালার দাম ছিল ১০ টাকা, ১০৮টি বেলপাতার মালা ৩০ টাকা।
পুজো কমিটিগুলির মাথায় হাত পড়লেও চাষিরা যে দু’টো পয়সার মুখ দেখেছেন, তা অবশ্য সুখবর। ফুল চাষি ও ব্যবসায়ীদের নেতা নারায়ণ নায়েকের মতে, অতিবৃষ্টিতে ফুলচাষে যে ক্ষতি হয়েছিল, চাষি ও ব্যবসায়ীরা তা কিছুটা পূরণ করতে পেরেছেন এই পুজোর মরসুমে।
জবারই গুণ বলতে হবে!