একটুও আলো ঢোকে না ঘরটায়। জানলা নেই। ছোট একটা কাঠের দরজা সব সময় বন্ধ। কখন যে সূর্য উঠছে, কখন অস্ত যাচ্ছে— বোঝার উপায় ছিল না। আতঙ্কের তিনটে দিন-রাত সেখানে কী ভাবে কাটালাম, এখন ভাবতেই অবাক লাগছে!
সোমবার রাতে বাড়ি ফেরার সময়ে আমাকে ধরেবেঁধে গাড়িতে তুলেছিল ওরা। প্রথমে যখন একটা ঘরে ঢুকিয়ে বসিয়ে রাখে, আমার আন্দাজ অনুযায়ী, সেটা মঙ্গলবার সকাল। পরে মুখে কাপড় বাঁধা অবস্থাতেই কোমরে দড়ি বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে যায় অন্য একটি বাড়িতে। ঘরে ঢুকিয়ে মুখ থেকে কাপড় খুলে দিয়েছিল। হাতের দড়িটাও।
ইটের গাঁথনির দেওয়ালে পলেস্তরা নেই। মাটির মেঝে। খড় বিছিয়ে ত্রিপল পেতে রাখা ছিল। আর ছিল তেলচিটে পড়া দু’টো কম্বল, তাতে বিশ্রী গন্ধ। প্রস্রাব করার জন্য রেখেছিল একটা টিনের ড্রাম। পেটে মোচড় পড়লে উপায় নেই। ঘরেই করতে হবে, বলেছিল ওরা। শুধু রাতে এক বার জঙ্গলে নিয়ে যেত। তখনই হাল্কা হতাম।
অনেক দূরে গাড়ি যাতায়াতের আওয়াজ ভেসে আসত। আশপাশের ঘরে ওই লোকগুলোর কথাবার্তাও শোনা যেত। এক বার শুনলাম হিন্দি না ভোজপুরিতে কী যেন আলোচনা করছে, আমার বাবার কাছে কত টাকা চাইবে। মুক্তিপণ না কি!
দুপুরে ঝকঝকে স্টিলের থালায় ভাত, ডাল, সব্জির ঘ্যাঁট আর কাটা পোনার ঝোল দিত। রাতে ফের ঘ্যাঁট আর রুটি। রোজ এক মেনু। গলা দিয়ে না নামলেও এক রকম জোর করেই ভাত বা রুটি খাচ্ছিলাম। শরীরটা তো যে করেই হোক রাখতে হবে। পালাতে হবে। মাঝে এক বার এক জন এসে বলেছিল, ‘অন্য কিছু খেতে ইচ্ছে করলে বল। হয়ে যাবে’। চা খাব কি না, সকাল-বিকেল জেনে যাচ্ছিল। খাইনি। বসে থাকতে-থাকতে মাঝে-মাঝে ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। বৃহস্পতিবার সকালে মনস্থির করি, যে করে হোক পালাবই। তাই সে দিন ঠেসে খেয়েছিলাম। না হলে হয়তো রাতে অত দৌড়তে পারতাম না!
(অপহরণকারীদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে আসা ব্যবসায়ী)