‘বিষ্ণুপুরের মুখ’ বলে পরিচিত মন্দিরগুলি দেখতে যাওয়ার রাস্তা এমনই। এই শহরের গর্ব বালুচরীর অনেক বন্ধ তাঁতে জমেছে ধুলো। ছবি: শুভ্র মিত্র।
চলতি বছরের মে মাসে বাঁকুড়া সফরে এসে বিষ্ণুপুরকে হেরিটেজ সাইট ও বালুচরীর উন্নয়নে নানা পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার এই জেলার খাতড়ার কেচেন্দায় একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন, শিলান্যাস এবং পরিষেবা প্রদান অনুষ্ঠানে এসে ফের সেই একই আশ্বাস শোনা গেল। মমতা শোনালেন বিষ্ণুপুরের পর্যটনের উন্নয়ন ও বিশ্বের দরবারে বালুচরীকে তুলে ধরার কথা।
কিন্তু তাঁতশিল্পী ও এলাকার পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের অভিজ্ঞতা, গত ছ’মাসে মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী কোনও পদক্ষেপ করতে সরকারি আধিকারিক বা জনপ্রতিনিধিদের দেখা যায়নি। এই শহরে ২২টি মন্দির ও সৌধ ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ অধিগৃহীত। যা দেখতে ভিড় জমান দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের বহু পর্যটক। এখানেই বোনা হয় নবাবি আমলের বিখ্যাত বালুচরী শাড়ি। যার সমাদর এ দেশ ছাড়িয়ে অন্য দেশেও।
কিন্তু প্রাচীন এই শহরের রাস্তাঘাট এখনও ভাঙাচোরা। সে দর্শনীয় দলমাদল কামান দেখার রাস্তাই হোক বা রাসমঞ্চ, গড়দরজা। সর্বত্র একই চেহারা। শহরে ঢোকার রাস্তা এতই সঙ্কীর্ণ যে পর্যটকদের শহরে গাড়ি বা বাস নিয়ে ঢুকতে হিমশিম খেতে হয়। ফলে বিষ্ণুপুরে বেড়াতে আসা মানুষজনের গলায় এ নিয়ে বিস্তর ক্ষোভের কথা শোনা যায়। বিষ্ণুপুরে ঢোকার জন্য নতুন রাস্তার দাবি উঠেছে তাই। যা আজও বাস্তবায়িত হল না। সংস্কার হয়নি ঐতিহ্যমণ্ডিত সাতটি বাঁধের। পর্যটকদের পাশাপাশি এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে এলাকার বাসিন্দাদেরও। শহরের রাস্তায় শৌচাগার ও পানীয় জলের সুব্যবস্থাও বিশেষ নেই। ফলে অন্য রাজ্যের পর্যটন কেন্দ্রগুলো যেখানে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েছে, সেখানে বলা ভাল বিষ্ণুপুর উল্টে বেশ পিছিয়েই রয়েছে।
আর যে বালুচরী শাড়ি শিল্পীদের উন্নয়নের কথা মুখ্যমন্ত্রী বাঁকুড়ায় এসে বারবার বলছেন তার অবস্থাও তথৈবচ। বিপণন ব্যবস্থা এখনও সে ভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে দিন দিন রুগ্ন হচ্ছে এই শিল্পী। অর্থকষ্টে ভুগছেন শিল্পীরা। আগে এই শহরে ১২০০-র বেশি তাঁত চালু থাকলেও এখন তা কমতে কমতে ৩০০-র নীচে নেমে গিয়েছে। তাঁতশিল্পীদের ক্ষোভ, “বাম জমানা থেকেই শুনছি আমাদের জন্য এটা হবে, ওটা হবে। তৃণমূল সরকারেরও চার বছর পেরিয়ে গেল, কাজের কাজ কিছুই হল না। আমাদের ওই শিল্প থেকে সরে অন্য পেশায় চলে যেতে হচ্ছে।” হতাশা প্রকাশ করে তাঁদের প্রশ্ন— ‘‘তাহলে আমাদের বাঁচানোর জন্য সরকারের পরিকল্পনাটা কী? যদি কোনও সুফলই না পেলাম কেন বারবার এই আশ্বাসের কথা শোনানো হচ্ছে?’’
এ বিষয়ে বিষ্ণুপুরের পুরপ্রধান তথা রাজ্যের মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণুপুরকে হেরিটেজ সাইট হিসেবে গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। এ বিষয়ে পর্যটন ও পুরাতত্ত্ব বিভাগের আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। পুজো মরসুমের পরে আশা করছি দ্রুততার সঙ্গে কাজ শুরু হবে।” কিন্তু পরিকল্পনা নিয়ে বিশদে তিনি কিছু জানাননি। বিষ্ণুপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার সোসাইটির সভাপতি তথা বিষ্ণুপুর পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর রবিলোচন দে বলেন, “বালুচরীর উন্নয়ন নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। বিশ্ব বাজার গড়ে তোলা নিয়ে নানা স্তরে আলোচনা চলছে। মুখ্যমন্ত্রীর সদিচ্ছা থাকায় আমরা আশাবাদী এই শিল্পের দূরাবস্থা কাটবে।” কিন্তু সেই তো আশ্বাসের কথা। বিষ্ণুপুরের মানুষ এ বার সত্যিকারের কাজ দেখতে চাইছেন।