ফসলে ক্ষতি, সেচের জল নিয়ে ক্ষোভই অস্ত্র বামের

ফসলের ন্যায্য দাম না মেলায় চাষিমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সেচের জলের অভাবে নষ্ট হচ্ছে মাঠের ধান। শিলাবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে দলবাজি করছেন তৃণমূল নেতারা।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০১৫ ০১:১০
Share:

বর্ধমানে জাঠায় তোলা হচ্ছে সে সব প্রশ্নই। ফাইল চিত্র।

ফসলের ন্যায্য দাম না মেলায় চাষিমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সেচের জলের অভাবে নষ্ট হচ্ছে মাঠের ধান। শিলাবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে দলবাজি করছেন তৃণমূল নেতারা।

Advertisement

মূলত এই তিন অভিযোগে ক্ষোভ উস্কে দিয়েই বর্ধমানের গ্রামাঞ্চলে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে সিপিএম। দলের জেলা নেতাদের ধারণা, ওই তিনটি বিষয় নিয়ে কয়েক লক্ষ চাষির একটা বড় অংশের ক্ষোভ রয়েছে। সিপিএম তা কাজে লাগাতে চাইছে। নেতাদের মতে, কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বরাকরের সঙ্গে সুবর্ণরেখার সংযুক্তিকরণ হলে জেলার সেচে তো বটেই, আসানসোল ও দুর্গাপুরে পানীয় জলের সমস্যাও দেখা দেবে। অথচ তা নিয়ে রাজ্য সরকারের কোনও প্রতিবাদ নেই। শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন সংস্থা ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় চিঠিও দিয়েছে।

আপাতত রণকৌশল হিসেবে গ্রামে-গ্রামে বামেদের জাঠায় তুলে আনা হচ্ছে ওই সমস্যাগুলি। তারই সঙ্গে, বর্ধমান শহরের কথা মাথায় রেখে বামেদের স্লোগান— ‘বর্ধমান শহরকে শুকিয়ে দেওয়া চলবে না।’ সিপিএম নেতাদের অভিয়োগ, শহরের ভিতরে ‘লোকাল বাস’ ঢুকতে পারছে না। দক্ষিণ দামোদর এলাকার বাসিন্দাদের শহরে ঢুকতে গেলে ন্যূনতম ১৩-১৪ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। তাঁরা সেই হয়রানি সহ্য করে, অতিরিক্ত খরচ করে শহরে ঢুকতে চাইছেন না। তার ফলে ব্যবসা মার খাচ্ছে।

Advertisement

বাম নেতৃত্ব মনে করছেন, রাজ্যের ‘শস্যগোলা’ বর্ধমানে হালে পানি পেতে গেলে চাষি, খেতমজুর, দিনমজুরদের মধ্যে আস্থা ফিরে পেতে হবে। আর সেই কারণেই ওই ধরনের দাবি জাঠার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকার ৪২০০টিরও বেশি বুথে পৌঁছে দিতে চাইছে সিপিএম। যার মধ্যে কেতুগ্রাম ১ ও মঙ্গলকোট-সহ বিভিন্ন এলাকা এখনও ‘সন্ত্রস্ত’। তা সত্ত্বেও, গত কয়েক দিনে সিপিএম আড়াই হাজারেরও বেশি বুথে জাঠা করেছে। দলের জেলা সম্পাদক অচিন্ত্য মল্লিক বলেন, “ছটপুজো থাকায় শিল্পাঞ্চলে জাঠা শুরু হয়নি। শুক্রবারের পর থেকে ওখানেও জাঠা শুরু হবে।” জাঠা ঘিরে অশান্তিও হয়েছে জামালপুর, ভাতার, বর্ধমানে। সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, “এ মাসের গোড়া থেকে জাঠা শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে তৃণমূল বুঝতে পারেনি জাঠা জিনিসটা কী? যখন দেখল আমাদের জাঠা মানুষের বাড়ির উঠানে গিয়ে তৃণমূলের পাকা ধানে মই দিয়ে দিচ্ছে, তখনই শুরু হল আক্রমণ। বিভিন্ন জায়গায় পাল্টা প্রতিরোধও শুরু হয়ে গিয়েছে।”

সিপিএম নেতৃত্বের অভিযোগ, ধান ও আলু তো ছিলই, এ বার ফুলকপির দাম না পেয়েও চাষিকে আত্মহত্যা করতে হয়েছে। ধান কেনার পরিকাঠামো নেই, সব্জি বাজারও তৈরি হয়নি। কিসান মান্ডির নামে বড় বড় ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার কাজ কী, সেটাই চাষিরা বুঝতে পারছেন না। এর ফলেই উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য ধাম না পেয়ে চাষিকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হচ্ছে। কৃষক সভার সম্পাদক তথা জেলা বামফ্রন্টের আহ্বায়ক অমল হালদারের মতে, “এ বার আবার বন্যার পরে খরা পরিস্থিতি তৈরি করা হল। ডিভিসি খাল থাকলেও সেচের জল দিতে পারল না প্রশাসন। যার ফলে মাঠের ধানকে কার্যত খুন করা হল।”

Advertisement

এ বার জেলায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার জমিতে ধান চাষ হয়েছে, যার মধ্যে দেড় লক্ষ জমিতে এখনও সেচের ব্যবস্থা নেই। আবার, সেচের ব্যবস্থা রয়েছে এমন ৪৩১টি মৌজায় ফলনের সময়ে জল পৌঁছায়নি। ফলে জেলার চাষিদের ‌একাংশ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ছাড়াও, শিলাবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে তৃণমূলের দলবাজিক অভিযোগ তুলেও জাঠা ঘুরছে গ্রামে-গ্রাম। সিপিএমের অভিযোগ, প্রকৃত চাষির বদলে ভুয়ো চাষিরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। সে কারণে বর্ধমান সদরের একটি গ্রামে তৃণমূল নেতাকে বিদ্যুতের খুঁটিতে আটকেও রেখেছিলেন গ্রামবাসীরা। অমলবাবু বলেন, “এ রকম সব হাতে-গরম উদাহরণই আমরা জাঠায় তুলে ধরছি।” দলের জেলা সম্পাদক অচিন্ত্য মল্লিকের দাবি, “কয়েক মাস আগেও জাঠা হয়েছিল, কিন্তু মানুষের কাছ থেকে সাড়া পায়নি। এ বারের জাঠাতে লোক যেমন হচ্ছে, তেমনি গ্রামে-গ্রামে স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ করছি।”

বামেদের এই জাঠা নিয়ে তৃণমূল নেতারা অবশ্য খুব একটা চিন্তিত নন, অন্তত প্রকাশ্যে । রাজ্যের মন্ত্রী তথা তৃণমূলের জেলা সভাপতি (গ্রামীণ) স্বপন দেবনাথের বক্তব্য, “একট রাজনৈতিক দল কর্মসূচি গ্রহণ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। তার জন্য সিপিএম ঘুরে দাঁড়াবে, এটা ভাবা মূর্খামি। আগামী বিধানসভা ভোটে সিপিএম কোনও দাগই কাটতে পারবে না।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement