সুন্দরবন

বিধি ভেঙে নির্মাণে অভিযুক্ত এ বার পর্যটন নিগমের লজও

উপকূল বিধি ভেঙে সুন্দরবনে নির্মাণকাজের অভিযোগ উঠছিল মূলত বেসরকারি হোটেলের বিরুদ্ধে। জাতীয় পরিবেশ আদালত ঝাঁপ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায় কোপও পড়ছিল ওই ধরনের কিছু লজ-হোটেলে। এ বার ওই এলাকায় বিধি ভেঙে নির্মাণ-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল রাজ্যের পর্যটন দফতরও।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৭ অগস্ট ২০১৫ ০৩:০৭
Share:

উপকূল বিধি ভেঙে সুন্দরবনে নির্মাণকাজের অভিযোগ উঠছিল মূলত বেসরকারি হোটেলের বিরুদ্ধে। জাতীয় পরিবেশ আদালত ঝাঁপ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায় কোপও পড়ছিল ওই ধরনের কিছু লজ-হোটেলে। এ বার ওই এলাকায় বিধি ভেঙে নির্মাণ-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল রাজ্যের পর্যটন দফতরও।

Advertisement

অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন বেসরকারি হোটেলের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের অধীনে থাকা সজনেখালি ট্যুরিস্ট লজও নিয়মবিধির তোয়াক্কা না-করে কংক্রিটের নির্মাণকাজ চালিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি সংস্থা বলেই কি তারা বেআইনি নির্মাণ করেও পার পেয়ে যাবে? এই বিষয়ে বৃহস্পতিবার ওই নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের জবাব তলব করেছে কলকাতায় জাতীয় পরিবেশ আদালতের বিচারপতি প্রতাপকুমার রায় ও বিশেষজ্ঞ-সদস্য পি সি মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ।

আদালত এ দিন নির্দেশ দিয়েছে, উপকূল বিধি অনুযায়ী সুন্দরবনে নদীর পাড় থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে নতুন করে কোনও ধরনের নির্মাণকাজ করা যাবে না। সম্প্রতি গদখালিতে জেলা পরিষদের একটি বাড়ি নদীর পাড়ে তৈরি করা হয়েছে। সেটা ভেঙে ফেলার জন্য আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি ভাঙা হয়নি। সজনেখালির ট্যুরিস্ট লজের মতো জেলা পরিষদের ওই সরকারি বাড়িটিও পড়েছে প্রশ্নের মুখে। ওই বাড়ির ক্ষেত্রে কেন তাদের নির্দেশ রূপায়ণ করা হয়নি, সেই ব্যাপারেও দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসকের রিপোর্ট চেয়েছে পরিবেশ আদালত। আদালতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী ব্রাত্য বসু এ দিন বলেন, ‘‘আমরা সজনেখালি ট্যুরিস্ট লজের জন্য উপকূল বিধি মেনে ছাড়পত্র নিয়েছি। আদালত যে-রিপোর্ট চেয়েছে, তা-ও জমা দেওয়া হবে।’’

Advertisement

সুন্দরবনের দূষণ নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে মামলা দায়ের করেছিল জাতীয় পরিবেশ আদালত। সেই মামলাতেই ওই উপকূল এলাকায় নিয়মবিধি ভেঙে হোটেল গড়ে ও অন্যান্য নির্মাণকাজ, দূষিত ডিজেলে (কাটাতেল) মোটরবোট চালানো এবং ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের অভিযোগ ওঠে। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশ মেনেই বিধি ভেঙে গড়ে ওঠা এবং ছাড়পত্রহীন হোটেল-লজগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের হোটেল-মালিক সংগঠনের সহ-সভাপতি প্রবীর সিংহরায়ের অভিযোগ, হোটেল বন্ধ করার জন্য যে-তালিকা জমা পড়েছিল, তা থেকে সরকারি কর্তাদের মর্জিমাফিক কিছু হোটেল ও লজ বন্ধ করা হয়েছে। বাকি হোটেলগুলিকে ছাড় দিয়েছেন পরিবেশ দফতরের কর্তারা। এই নিয়ে পরিবেশ দফতর ও পর্ষদের কর্তাদের কাছে দরবারও করেছেন তাঁরা।

হোটেল-মালিকদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, জমা দেওয়া তালিকায় উল্লিখিত হোটেল-লজের মধ্যে একমাত্র সজনেখালি ট্যুরিস্ট লজেরই ছাড়পত্র রয়েছে। তালিকাভুক্ত অন্য সব হোটেলই বন্ধ করা হয়েছে। বাকি হোটেলগুলির বেশ কয়েকটি এমনিতেই বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি আরও বিশদ ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ব্যাপারে পর্ষদে নিয়মিত শুনানিও চলছে।

সুন্দরবনের পরিবেশ দূষণের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য তিন জন আইনজীবীকে (অ্যাডভোকেট কমিশনার) নিযুক্ত করেছিল আদালত। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের আইনজীবী অর্পিতা চৌধুরী এবং এই মামলায় আদালত-বান্ধব পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তকে নিয়ে ওই তিন জন সুন্দরবন পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তার ভিত্তিতে ওই তিন জন এ দিন একটি অন্তর্বর্তী রিপোর্ট পেশ করেন। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী থেকে মোটরবোটের তেলের নমুনা সংগ্রহ করেছিল পর্ষদ। এ দিন সেই তেলের নমুনা বিশ্লেষণী রিপোর্ট আদালতে জমা দেন অর্পিতাদেবী। পর্ষদ সূত্রের খবর, বেশ কিছু মোটরবোট এখনও কাটাতেলে চলছে। সেগুলি দ্রুত বন্ধ করার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য সারা দক্ষিণবঙ্গের প্রাকৃতিক রক্ষী। সেই সম্পদের নির্বিচার নিধন উদ্বেগ বাড়িয়েছে পরিবেশবন্ধুদের। ওই সব এলাকায় গাছ ধ্বংস করে মাছের ভেড়ি গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের নির্মাণকাজও হয়েছে। এ দিন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ধ্বংস প্রতিরোধে কড়া নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ আদালত। অরণ্য নিধন করে বানানো ভেড়ি ও নির্মাণ-কাঠামো অবিলম্বে বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

ম্যানগ্রোভ বাঁচানোর নির্দেশের পাশাপাশি সুন্দরবনকে প্লাস্টিকমুক্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করতে বলেছে পরিবেশ আদালত। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ অনেক আগেই সুন্দরবনে প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের নির্দেশিকা জারি করেছিল। কিন্তু সেই নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনেক জায়গাতেই যথেচ্ছ প্লাস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে পরিবেশকর্মী সুভাষবাবুর অভিযোগ। এই অবস্থায় প্লাস্টিক-মুক্তির নির্দেশ রূপায়ণে জোর দিচ্ছে পরিবেশ আদালত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement