বঙ্গে ‘মানুষের জোট’ চাই, সুর সিপিএমেই

খাতায়-কলমে হয়তো কঠিন পথ! দলের আদর্শগত অবস্থানের প্রশ্নে হয়তো বিরাট আপস! প্রকাশ কারাটের মতো দলের কট্টরপন্থী নেতাদের কাছে হয়তো হৃৎকম্প হওয়ার প্রশ্ন! তবু বাস্তব তো কঠিন! তাই বিহারের ফলাফলের ধাক্কায় এ বার বাংলাতেও বৃহত্তর জোটের পক্ষে আওয়াজ জোরালো হতে শুরু করল।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:৫৩
Share:

খাতায়-কলমে হয়তো কঠিন পথ! দলের আদর্শগত অবস্থানের প্রশ্নে হয়তো বিরাট আপস! প্রকাশ কারাটের মতো দলের কট্টরপন্থী নেতাদের কাছে হয়তো হৃৎকম্প হওয়ার প্রশ্ন! তবু বাস্তব তো কঠিন! তাই বিহারের ফলাফলের ধাক্কায় এ বার বাংলাতেও বৃহত্তর জোটের পক্ষে আওয়াজ জোরালো হতে শুরু করল।

Advertisement

বস্তুত, বিহারে নীতীশ কুমার-লালুপ্রসাদ যাদবেরা যা করেছেন, এই বঙ্গের শিলিগুড়িতে তা আগেই করে দেখিয়েছেন সিপিএমের অশোক ভট্টাচার্য। তৃণমূল যখন প্রবল পরাক্রমশালী, তখন তার মোকাবিলায় সব বিরোধী দলের সমর্থকদের নিচু তলায় এককাট্টা করে ফেলে প্রথমে শিলিগুড়ি পুরসভা ও পরে মহকুমা পরিষদে বামেদের জয়ের রাস্তা দেখিয়েছেন অশোকবাবু। বিহারের ফলের রসায়নও একই। সেখানে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি-র রুখতে একজোট হয়েছেন নীতীশ-লালুর মতো আপাত-অসম্ভব দুই রাজনৈতিক শক্তি এবং তাঁদের পিছন থেকে সমর্থন দিয়েছে কংগ্রেস। ফলে, মোদীর ভোট কমুক বা না কমুক, বিরোধী ভোট এক জায়গায় এসে গেরুয়া বাহিনীর পালের হাওয়া কে়ড়েছে। স্বভাবতই সিপিএমেই এখন প্রশ্ন উঠেছে, এ রাজ্যে তৃণমূলকে হারাতেই বা বৃহত্তর জোট হবে না কেন?

নির্বাচনী রাজনীতিতে দলের কর্মী-সমর্থকদের এই প্রশ্ন যে নিছক তাত্ত্বিক অবস্থান দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা কঠিন, তার ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে বিহারে ফল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। পুরুলিয়ায় দলের প্রয়াত নেতা দীনবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সোমবার সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য ও বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেছেন, ‘‘নীতীশ কুমার ও লালুপ্রসাদ যাদব যে ভাবে জোট বেঁধে মোদীকে তফাত যাও বলে দিতে পেরেছেন, সে ভাবেই এ রাজ্যেও ঐক্যবদ্ধ ভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে দিদিভাইকেও ফেরত পাঠাতে হবে! তবেই প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধার্পণ করা হবে।’’ তিনি কি বিহারের মতো বাংলাতেও আগামী বিধানসভা ভোটে বৃহত্তর জোটের পক্ষে সওয়াল করছেন? পরে প্রশ্নের জবাবে বিমানবাবু যেমন সরাসরি বিভিন্ন দলকে নিয়ে জোটের কথা বলেননি, তেমনই বিরোধিতাও করেননি! তিনি বলেন, ‘‘বাংলার মানুষ নানা সমস্যায় জেরবার। বিহারে যে ভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে মোদীভাইকে ফেরত পাঠানো গিয়েছে, সে ভাবেই এখানে দিদিভাইকে ফেরত পাঠাতে হবে!’’ যদিও তিনি জুড়েছেন, ‘‘ডিসেম্বর অবধি ভোট নিয়ে কথা বলছি না। তবে মানুষকে জোট বাঁধতে হবে।’’

Advertisement

মানুষের জোটের কথা ইতিমধ্যেই তুলে দিয়েছেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। কলকাতায় এসে তিনি বলে গিয়েছেন, ‘‘রাজনীতি পাটিগণিত নয়। এখানে দুয়ে-দুয়ে সব সময় চার হয় না! বিজেপি-র সাম্প্রদায়িকতাকে রুখতে বিহারের মানুষ চেয়েছিলেন বলেই লালু-নীতীশ এক হয়েছিলেন। বাংলাতেও মানুষ যা চাইবেন, তা-ই হবে!’’ তাঁর সুরেই শিলিগুড়ির মেয়র অশোকবাবু বলেছেন, ‘‘মানুষ কী চাইছেন, আমাদের সেটাই ভাবতে হবে!’’ সিপিএম সমর্থকদের একাংশ গত পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক কৌশলগত পর্যালোচনা রিপোর্টের অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে দেখাতে শুরু করেছেন, রাজ্যওয়াড়ি পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ কী ভাবে সেখানে খুলে রাখা আছে! শিলিগুড়িতে গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির বোর্ড গ়়ড়তে বাম-কংগ্রেসের হাত মেলানোর দৃষ্টান্তও দিচ্ছেন অনেকে।

তবে এটা ঘটনা, তৃণমূলের বরাবরের ‘দুর্বল জায়গা’ শিলিগুড়ি আর গোটা বাংলা এক নয়। আবার বিহার ও বাংলাও এক নয়! তবু ‘মানুষের চাপে’র কথা মাথায় রেখে বামেদের সঙ্গে সমঝোতার যুক্তি একেবারে খারিজ করতে পারছেন না প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বও। দলের রাজ্য নেতৃত্বের বড় অংশ সরাসরিই বামেদের হাত ধরার কথা বলেছেন। বিমানবাবুর আহ্বানের প্রেক্ষিতে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী অবশ্য তুলনায় সতর্ক অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘‘বিহারে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে মহাজোট হয়েছিল। বাংলায় স্বৈরাচারী সরকার চলছে। কিন্তু এখনও এখানে বিভিন্ন দলের জোট হওয়ার পরিস্থিতি আসেনি।’’ তিনি যোগ করতে ভোলেননি, ‘‘প্রয়োজনে, মানুষের চাপ থাকলে বিরোধীদের জোট হবে। তবে আমরা একা তো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। হাইকম্যান্ড নির্দেশিকা দেবে।’’

কংগ্রেসের এই দোলাচলের মাঝেই সিপিএমের হাত বেঁধে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের বৃহত্তর বাম ঐক্যের শরিকেরা। এসইউসি-র সাধারণ সম্পাদক প্রভাস ঘোষ যেমন বিহারের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েও বিবৃতিতে বলেছেন, ওই রাজ্যে মহাজোটের শরিকদের কাউকেই গণতান্ত্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষ বলা যায় না! সিপিএমের মধ্যে কট্টরপন্থীদের মতও একই রকম। যা দেখে দলেরই এক সাংসদ বলছেন, ‘‘ভোটের রাজনীতি করব অথচ মানুষের চাহিদা না বুঝে নিজেদের তাত্ত্বিক মত চাপিয়ে দেব— এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হয় না!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement