দলীয় বৈঠকে যাওয়ার পথে। শুক্রবার। — নিজস্ব চিত্র।
মান্না দে গেয়েছিলেন, ‘আমি তোমারই দিকটা নিলাম’। কিন্তু দ্বন্দ্ব-দোলাচলের সঙ্কট কালে তমালিকা পণ্ডা শেঠ নিলেন দলের দিকটা!
পতি লক্ষ্মণ শেঠ সদ্য বহিষ্কৃত। লক্ষ্মণ-জায়া এখনও সিপিএম নেত্রী। পতির বহিষ্কারের পরে পত্নীর দিকে আলাদা করে নজর পড়বে, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু তমালিকাদেবী এগিয়ে রাখছেন নিজের দলীয় সত্তাকেই। লক্ষ্মণবাবুকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিয়ে বলছেন, “দলের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত।”
দলও তমালিকাদেবীর উপরে আস্থা রাখছে। তমলুকে শুক্রবার সিপিএমের জেলা কার্যালয়ে নির্বাচনী বৈঠকের পরে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে হলদিয়া বিধানসভা এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে লক্ষ্মণ-জায়াকেই। ২০০৯ সালের ভোটে মহিষাদল বিধানসভার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পূর্ব মেদিনীপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রবীন দেবের কথায়, “উনি (তমালিকা) কষ্ট পেয়েছেন, তবে চেষ্টা করেছেন। আশা করি, ভোটে নিজের দায়িত্ব যথাযথ ভাবেই পালন করবেন।” বৈঠক শেষে তমালিকাদেবীও জানিয়েছেন, দলের নির্দেশ মেনে তিনি দায়িত্ব সামলাবেন।
লক্ষ্মণবাবুকে নিয়ে প্রবল টানাপড়েন চলছিল কিছু দিন ধরেই। তাতে সর্বশেষ সংযোজন ছিল তমলুকের প্রাক্তন সাংসদের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা। এর পরেই একদা হলদিয়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আলিমুদ্দিন। তমালিকাদেবীও বহিষ্কারের কথা জেনেছেন শুক্রবার সন্ধ্যাতেই। লক্ষ্মণবাবু যে এমন ভাবছেন, তার আঁচ কি পেয়েছিলেন? তমালিকাদেবীর জবাব, “তিনি এমন ভাবছেন, জানতাম না। তাই কিছুটা অবাক হয়েছি, আবার হইওনি! আসলে উনি দীর্ঘদিন যন্ত্রণায় ছিলেন। দলও তো সব জানে!”
নন্দীগ্রাম নিখোঁজ-মামলায় জামিন পেলেও আদালতে হাজিরার দিন ছাড়া পূর্ব মেদিনীপুরে ঢোকা বারণ লক্ষ্মণবাবুর। এখন একাই কলকাতায় রয়েছেন। স্বামীর কাছে কি যাবেন? এ বার তমালিকাদেবী নির্লিপ্ত। বললেন, “প্রচারে চাপ বাড়ছে। এখন ওঁর কাছে যাওয়ার সময় নেই। আর গেলে দলের অনুমতি নিয়েই যাব।”
আপাতত রাজনীতিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হলদিয়া পুরসভার কাউন্সিলর তথা সিপিএম জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তমালিকাদেবীর কাছে। শিয়রে লোকসভা ভোট। হলদিয়ার বাড়ি থেকেই পার্টির কাজকর্ম করছেন তিনি। তমলুক কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী শেখ ইব্রাহিম আলির প্রচারে যাচ্ছেন, কর্মিসভাও করছেন। পর পর তিন বার এই তমলুক থেকে জিতেই সংসদে গিয়েছিলেন লক্ষ্মণবাবু। শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরেছিলেন গত বার। লক্ষ্মণবাবুর বহিষ্কারের পরে দলে তমালিকাদেবীর গুরুত্ব ক্রমশ কমবে বলে ইতিমধ্যে চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে। সিপিএমের অন্দরেই একাংশের মত, স্বামীর হাত ধরেই রাজনৈতিক উত্থান লক্ষ্মণ-জায়ার। তা সে মহিষাদলের বিধায়ক হওয়া হোক বা হলদিয়ার পুরপ্রধান, কিংবা গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির রাজ্য কমিটির সদস্যপদ প্রাপ্তি। তমালিকাদেবীর অবশ্য ব্যাখ্যা, “কাজ ও দলের প্রতি নিষ্ঠাই আমাকে এই জায়গা দিয়েছে। অন্য কিছু নয়।”
কিন্তু লক্ষ্মণবাবুর বহিষ্কারের পরে তো আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে? এমন সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিচ্ছেন তমালিকাদেবী। তাঁর জবাব, “আড়াই বছর উনি হলদিয়ায় নেই। স্বামী-স্ত্রীর এমন দৃষ্টান্ত দলে অনেক আছে। দলের কাজকর্মের গোপনীয়তা বজায় রাখার দায়িত্ব আমার। আমি নিশ্চিত, উনিও পার্টির গোপন কথা জানতে চাইবেন না! ৪৪ বছর ধরে উনিও তো পার্টি করেছেন! দলের নীতিশিক্ষা তাঁর রয়েছে।” তিনি মনে করিয়ে দেন, “পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের সীমারেখা বুঝেই দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করছি।”
লক্ষ্মণ-ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত সিপিএমের পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক কানু সাহু বলেন, “তমালিকার প্রতি ভরসা আছে। সমস্যা হবে না।” তবে লক্ষ্মণ-বিরোধী গোষ্ঠীর সংশয় থাকছেই। দলের ভারপ্রাপ্ত জেলা সম্পাদক প্রশান্ত প্রধানের কথায়, “ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যৎই বলবে। এ নিয়ে এখন মন্তব্য করা অনুচিত।”
তৃণমূল নেতারা দাবি করতে শুরু করেছেন, লক্ষ্মণবাবু নন্দীগ্রাম নিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস করে সিপিএম-কে আরও বেকায়দায় ফেলবেন। সম্ভবত পরিস্থিতি আঁচ করেই শিলিগুড়িতে এক প্রশ্নের উত্তরে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বিমান বসু বলেছেন, “নন্দীগ্রামের ঘটনায় লক্ষ্মণের একটা ভূমিকা ছিল। তবে উনি একাই সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এমন নয়।” দলত্যাগীদের সকলের মধ্যেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আক্রমণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে কেন? বিমানবাবুর মত, “তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করার একটা সুবিধা রয়েছে! তাই সকলে এই পথ বেছে নিচ্ছেন।”
তমালিকাদেবী আপাতত মন দিচ্ছেন দলের দেওয়া দায়িত্ব পালনেই। স্পষ্ট জানাচ্ছেন, লক্ষ্মণবাবুর সঙ্গে তাঁর কোনও রাজনৈতিক আদান-প্রদান থাকবে না। এমনকী, স্বামীর কাছ থেকে পরামর্শও নেবেন না!
ঘরণী নয়, সিপিএম নেত্রীর ভাবমূর্তিই যে এগিয়ে!