প্লাস্টিক দিয়ে নানা জিনিস তৈরি করছে ছাত্রীরা। ছবি: সুশান্ত সরকার।
ছোট্ট একটা স্কুল। কাণ্ডকারখানা বিরাট।
ছুটির দিনে স্কুলের আলোয় আঁধার কাটছে গ্রামের। বৃষ্টির জল ধরে রেখে ব্যবহার হচ্ছে নানা কাজে। পড়ুয়াদের জ্যাম-জেলি-আচার তৈরি শিখিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার প্রাথমিক পাঠ দেওয়া হচ্ছে। স্কুলে সবে শুরু হয়েছে ওষধি গাছের চাষও।
হুগলির পান্ডুয়া ব্লকের দ্বারবাসিনী বালিকা বিদ্যালয় নামে ওই স্কুলের শিক্ষকরা চান, পড়ুয়াদের গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে। তাই স্কুলে বছরভর চলে নানা কর্মকাণ্ড। যা দেখে দ্বারবাসিনী গ্রামের বাসিন্দারাও মানছেন, এমন উদ্যোগ কার্যত নজিরবিহীন।
১৯৬৪ সালে তৈরি হওয়া স্কুলটিতে বর্তমানে ছাত্রীসংখ্যা ৭০০-এর বেশি। প্রধানশিক্ষক-সহ ১২ জন স্থায়ী এবং দু’জন পার্শ্বশিক্ষক রয়েছেন। নেই করণিক, নেই পর্যাপ্ত ঘর, নেই যথেষ্ট তহবিলও। তা সত্ত্বেও লক্ষ্য থেকে সরেন না স্কুল-কর্তৃপক্ষ। বরং নিত্যনতুন ভাবনাচিন্তাতেই নিজেদের এবং ছাত্রীদের উজ্জীবিত রাখেন তাঁরা।
বছর দেড়েক আগে সাংসদ রত্না দে নাগের তহবিলের টাকায় ৫.২৫ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌর-প্যানেল বসানো হয় স্কুলবাড়ির ছাদে। তার থেকেই স্কুলের ২১টি ঘরের আলো, পাখা থেকে শুরু করে কম্পিউটার, পাম্প— সবই চলে। ছুটির দিনে বিদ্যুৎ বাড়তি হলে তা রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার গ্রিড হয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যায়। অবশ্য বর্ষায় নিয়মিত রোদ না উঠলে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিতে হয় স্কুলকে। তবে, এই বিদ্যুৎ লেনদেন পরিমাপ করার কোনও যন্ত্রও নেই স্কুলে।
স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাঁরা সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি দিয়েছেন যাতে ওই মিটার বসানো হয়। সেই মতো হিসাব করে যদি বর্ষাকালে কেনা বিদ্যুতের দামে ছাড় মেলে তা হলে তাঁরা সেই টাকা অন্য কাজে ব্যয় করতে চান।
প্রাকৃতিক সম্পদকে কী ভাবে কাজে লাগানো যায়, পডুয়াদের কাছে সেই দৃষ্টান্তও তুলে ধরেছেন স্কুল-কর্তৃপক্ষ। নানা কাজে ব্যবহারের জন্য স্কুলে রয়েছে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থা। মিড-ডে মিল রান্নার পর উনুনের আধপোড়া কয়লা আলাদা করে রাখা হয়। সেই কয়লা নতুন কয়লার সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করায় মাসে প্রায় ১৭০ কেজি কয়লা বাঁচে এবং এই পদ্ধতিতে মাসে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা সাশ্রয় হয় বলে স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি। পড়ুয়াদের শেখানো হয় বাতিল প্লাস্টিক দিয়ে খেলনা, ঘর সাজানোর জিনিস তৈরি করা। সম্প্রতি স্কুলের মধ্যে শুরু হয়েছে ওষধি গাছের চাষ। পরিকল্পনায় রয়েছে জৈব গ্যাস ব্যবহার করে মিড-ডে মিল রান্না করা।
এতেই শেষ নয়।
দুঃস্থ পরিবার থেকে আসা পড়ুয়ারা যাতে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যে কর্মশিক্ষার ক্লাসে শেখানো হয় জেলি, আচার, স্কোয়াশ তৈরি করা। ঘরোয়া পদ্ধতিতে সে সব সংরক্ষণের উপায়ও বাতলে দেন দিদিমণিরা। দিদিমণিরা জানালেন, ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁদের মা-দিদিরাও উপকৃত হন। গতানুগতিক পড়াশোনায় যাতে পড়ুয়াদের একঘেয়েমি না আসে তার জন্য ক্লাস ঘরে প্রোজেক্টর লাগানো হয়েছে। পর্দায় ছবি দেখিয়ে শিক্ষকরা মেয়েদের পড়া বুঝিয়ে দেন।
প্রধানশিক্ষক কাকলি চক্রবর্তী মোদক বলেন, ‘‘আমরা স্কুলের পক্ষ থেকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। তাই গ্রামের স্কুলের নানা সমস্যা সামলেও ওই সব কাজ চলে। সহ-শিক্ষকরা সকলে হাত লাগান।’’
এত দিন স্কুলের নিজস্ব খেলার মাঠ ছিল না। স্কুলের নানা উদ্যোগে মুগ্ধ গ্রামবাসীরা এ জন্য এগিয়ে আসেন। শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁরাও অর্থ সাহায্য করেন। স্কুলবাড়ির পাশে সম্প্রতি প্রায় দু’বিঘা জমি কিনে বানানো হয়েছে মাঠ। বছরখানেক আগে শুরু হয়েছে ক্যারাটে প্রশিক্ষণ শিবিরও। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানান, মেয়েদের শারীরিক এবং মানসিক ভাবে মজবুত করে তুলতে এই উদ্যোগ।
স্কুলের এতো সব কাণ্ডকারখানার কথা গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছেছে জেলা প্রশাসনের কাছেও। জেলাপরিষদের সভাধিপতি মেহবুব রহমান জানিয়েছেন, স্কুলের তরফে জানানো হলে বিদ্যুতের মিটারের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করবেন। শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহারের মতে, ‘‘এ তো ঘোর অন্ধকারের মধ্যে অবিশ্বাস্য আলোর ঝলকানি বলে মনে হচ্ছে। ওঁরা পড়ুয়াদের বাস্তবমুখী শিক্ষা দিচ্ছেন। যেখানে জনগণের কল্যাণের কথা ভাবা হচ্ছে। ওঁরা আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নজির তুলে ধরছেন।’’