সিডব্লিউসি-তে নিয়োগে অনিয়মের নালিশ রাজ্যে

পোশাকি নাম শিশু কল্যাণ কমিটি (সিডব্লুউসি)। শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করাই এর কাজ। আর তাই এই কমিটির নিয়োগের ক্ষেত্রে সদস্যদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকেই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরার কথা।

Advertisement

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০৩:১৯
Share:

পোশাকি নাম শিশু কল্যাণ কমিটি (সিডব্লুউসি)। শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করাই এর কাজ। আর তাই এই কমিটির নিয়োগের ক্ষেত্রে সদস্যদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকেই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ধরার কথা। অথচ বেশ কয়েকটি জেলায় এই সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সূত্রের খবর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো জেলায় নিয়ম ভেঙে শাসক দলের সাংসদ, কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিদেরও সিডব্লিউসি-র সদস্য করা হয়েছে।

Advertisement

জেলা প্রশাসনের মতো সরকারের ‘শিশু সুরক্ষা আয়োগ’ এমন অভিযোগ করলেও রাজ্যের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজা যাবতীয় অনিয়মের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, ‘‘সরকার নিজের ইচ্ছেমতো কাউকে শিশু কল্যাণ কমিটির সদস্য করতে পারে। আইনেই এ কথা বলা আছে।’’ সমাজকল্যাণ দফতর সূত্রের খবর, প্রতিটি জেলায় একটি করে সিডব্লুউসি থাকার কথা। নিয়ম হল, এই কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন দেয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। উপযুক্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁদের একটি প্যানেল তৈরি করেন তাঁরা। তা পাঠানো হয় সমাজকল্যাণ দফতরে। দফতর সূত্রের খবর, সিডব্লুউসি-র সদস্য নির্বাচনের জন্য গত বছরের অগস্ট মাস থেকে জেলা স্তরে প্যানেল তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আর তার পর থেকেই অনিয়মের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে।

বীরভূম, নদিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়ার মতো অনেক জেলায় প্যানেলের প্রথম সারিতে থাকা বেশি নম্বরপ্রাপ্ত আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে নীচের দিকে থাকা অপেক্ষাকৃত কম নম্বর প্রাপকদের নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। আবার নদিয়া, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর চব্বিশ পরগনার মতো কয়েকটি জেলায় প্যানেলে নেই এমন লোকেদেরও সিডব্লিউসি-তে বাছাই করা হয়েছে।

Advertisement

সমাজকল্যাণ দফতরের একাংশ মানছেন, সিডব্লিউসি-র সদস্য নিয়োগের সরকারি নিয়মের মধ্যে গলদ রয়েছে। সরকারের ‘শিশু সুরক্ষা আয়োগ’ সমাজকল্যাণ সচিবকে চিঠি ( মেমো নম্বর—460/WBCPCR/15) দিয়ে জানিয়েছিল, ‘একাধিক জেলায় সিডব্লিউসি-র সদস্যদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই। অনেক জেলায় আবার বৈধ সিডব্লিউসি-রই অস্তিত্ব নেই।’ গত ফেব্রুয়ারিতে লেখা সেই চিঠিতে ২০ দিনের মধ্যে উত্তর চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আয়োগের চেয়ারম্যান অশোকেন্দু সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, কোনও উত্তর আসেনি। অশোকেন্দুবাবুর কথায়, ‘‘সরকারি নিয়ম মেনে অনেক জেলার জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপাররা যোগ্য সদস্যদের প্যানেল তৈরি করে দফতরে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু আমার কাছে অভিয‌োগ এসেছে, বেশ কিছু জেলায় প্যানেলে উপরের দিকে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের অজ্ঞাত কারণে বাদ দিয়ে নীচের দিকের প্রার্থীদের বাছাই করা হয়েছে।’’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘‘প্যানেলে নাম নেই এমন প্রার্থীদেরও চূড়ান্ত কমিটিতে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আবার কোনও জেলাশাসকের উপর সমাজকল্যাণ দফতরের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির তরফে প্যানেলে বাছাই প্রার্থীদের নাম বদলে দেওয়ার জন্য চাপও এসেছে।’’ অভিযোগ নিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্তারা সরাসরি মুখ খুলতে চাননি। নদিয়ার জেলাশাসক বিজয় ভারতী বা বীরভূমের মোহন গাঁধীরা বলেছেন, ‘‘আমাদের কাজ স্বচ্ছতা রেখে প্যানেল তৈরি করা। সেটা করেছি। বাকিটা সরকার বুঝবে।’’

এখন প্রশ্ন উঠেছে, মেধাতালিকার ভিত্তিতে যে প্যানেল জেলা প্রশাসন তৈরি করে দিচ্ছে, সমাজকল্যাণ দফতরের তা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে সরকারি টাকা খরচে বিজ্ঞাপন দেওয়া, ইন্টারভিউ কিংবা লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার কী প্রয়োজন? সরাসরি এর উত্তর না দিলেও মন্ত্রীর সাফাই, ‘‘জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের ২০ ধারা এবং ২বি উপধারা অনুযায়ী সরকার নিজের ইচ্ছেয় সিডব্লিউসি-র সদস্য নিতে পারে। প্যানেল থেকেই লোক নিতে হবে বা প্যানেলে প্রথম দিকে থাকা লোকেদেরই নিতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই।’’

সমাজকল্যাণ দফতরের একাধিক অফিসার জানান, অনাথ-অত্যাচারিত-ফেলে যাওয়া বা উদ্ধার হওয়া শিশুদের নির্দিষ্ট হোমে পাঠানো, তাদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা, হোমের পরিকাঠামো এবং সেখানে শিশুদের নজরদারি করা, দত্তক দেওয়া, বাবা-মা-র খোঁজ মিললে শিশুদের তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া, কোনও ভাবে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসা বিদেশি শিশুদের বাড়ি খুঁজে সেখানে পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার কথা সিডব্লুউসি-র। এই সব কাজে অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরই সদস্য করার কথা। সে জন্যই জেলা প্রশাসন বিজ্ঞাপন দিয়ে বাছাই তালিকা তৈরি করে পাঠায়। কিন্তু সাংসদ-বিধায়ক-কাউন্সিলরদের পুনর্বাসন দিতে সরকার নিজেই নিয়ম ভাঙলে কারও কিছু করার থাকে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement