সাধককে সামনে রেখে পর্যটন

এ শহরে সাধক রামপ্রসাদের জন্ম। এ শহরে তাঁর কত স্মৃতি! সাধক রামপ্রসাদের হাত ধরেই হালিশহরের ঐতিহ্যকে সকলের সামনে তুলে ধরতে উদ্যোগী পুরসভা। এই শহরকে দক্ষিণবঙ্গের একটি আদর্শ পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে চায় তারা।

Advertisement

অশোক সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৫ ০০:৩২
Share:

পুরসভার উদ্যোগে সাজা হয়েছে রামপ্রসাদের ভিটে। ছবি:প্রতিবেদক।

এ শহরে সাধক রামপ্রসাদের জন্ম।

Advertisement

এ শহরে তাঁর কত স্মৃতি! সাধক রামপ্রসাদের হাত ধরেই হালিশহরের ঐতিহ্যকে সকলের সামনে তুলে ধরতে উদ্যোগী পুরসভা। এই শহরকে দক্ষিণবঙ্গের একটি আদর্শ পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে চায় তারা।

রামপ্রসাদের (১৭২৩-১৭৭৫) মতো বর্ণময় জীবনের কথা এই প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। এক সময়ে বাগবাজারে দুর্গাচরণ মিত্রের সেরেস্তায় খাতা লিখতেন রামপ্রসাদ। কিন্তু হিসেব কোথায়? খাতাভর্তি তো ভক্তিগীতি! কাজে ফাঁকির অভিযোগ গেল দুর্গাবাবুর কাছে। সব লক্ষ্য করলেন মালিক। এর পর তিনি নাকি রামপ্রসাদের কাছে নতজানু হয়ে বলেন, গ্রামে ফিরে গিয়ে আপনি ধর্ম আর সঙ্গীতচর্চা করুন। প্রয়োজনীয় খরচ পৌঁছে যাবে সময়মতো। তার পরের সময়কাল তো রীতিমতো এক সোনালি অধ্যায়। ক্রমে ‘আইকন’ হয়ে উঠলেন রামপ্রসাদ। ইতিহাসের ধারাপাতে তার অনেকটাই চাপা পড়ে গিয়েছে। কলকাতার রামবাগানের নামকরণের নেপথ্যে থেকে গিয়েছেন এই সাধক।

Advertisement

সাধকের সেই সব স্মৃতিই তুলে ধরতে চায় পুরসভা। রামপ্রসাদের ভিটেতে কালীমন্দির, উপাসনাকক্ষ, প্রাচীন পঞ্চবটী, জলাশয়— সাংসদ এবং পুর তহবিলের অর্থে সুন্দর সংরক্ষণ করেছে ‘হালিশহর গুডউইল ফ্রেটারনিটি’। উল্টো দিকে শুরু হয়েছে নির্মাণকাজ। পুরসভার চেয়ারম্যান অংশুমান রায় বলেন, ‘‘এখানে একটি দোতলা ভবন তৈরির পরিকল্পনা করেছি। হবে শ্রীরামকৃষ্ণ, চৈতন্য, রামপ্রসাদের জীবন ও জীবনী নিয়ে একটি প্রামাণ্য সংগ্রহশালা। থাকবে প্রাচীন এই নগরীর নানা আলেখ্য। একসঙ্গে এতো বর্ণময় ঐতিহ্য রাজ্যের খুব কম জায়গাতেই রয়েছে। প্রতিটিই সুন্দর ভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। অনেকে বিশেষত পড়ুয়ারা তা জানে না। সবাইকে তা জানাতে চাই।’’ রামপ্রসাদ স্মৃতি মন্দিরের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে হালিশহর পুরসভার অনুদানে গঙ্গার ঘাটে ইতিমধ্যেই বসেছে সাধকের শ্বেতপাথরের আবক্ষ মূর্তি। বেদি-ফলকে লেখা ‘জীবনে শেষবারের মত মায়ের পুজো করে ভাগিরথীবক্ষে এই ঘাটে বিলীন হয়ে যান রামপ্রসাদ’। পাশে কৃত্রিম পাহাড়ের গায়ে ধ্যানমগ্ন হনুমান। রামপ্রসাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১২টি ঘটনা দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা হয়েছে ৪ ফুট বাই সাড়ে ৩ ফুটের ফ্রেমে। এগুলির অন্যতম ‘বাগবাজারের সেরেস্তায়’। প্রায় ১২০ বর্গফুটের একটি ফ্রেমে ‘সাধক সকাশে নবাব সিরাজ’। বাস-রাস্তার ধারে রামপ্রসাদের নামাঙ্কিত সুন্দর, সাজানো ঘাট। চওড়া, পাথরে বাঁধানো ৪৯টি ধাপ নেমে বিস্তীর্ণ গঙ্গা। ওপারে সাহাগঞ্জ।

ইতিমধ্যে রামপ্রসাদ, শ্রীচৈতন্য ও হালিশহর নিয়ে মহাফেজখানা তৈরি হয়েছে পুরভবনে। পরিকল্পনা রয়েছে রামপ্রসাদ-শ্রীচৈতন্যকে নিয়ে ‘আলো ও ধ্বনি’-র একটি প্রকল্প তৈরিরও। অংশুবাবু জানান, বিভিন্ন পুর-প্রকল্প থেকে কিছু বাঁচিয়ে অর্থ সংস্থানের চেষ্টা চলছে। পর্যটন এবং পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের কাছেও সাহায্য চাওয়া হবে।

‘হাভেলি শহর’ থেকে হালিশহর। তবে, এ শহর শুধুই রামপ্রসাদের নয়। এখানে বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায় ও রানি রাসমণিরও জন্ম। বাগমোড়ে স্থাপিত হয়েছে রাসমণির পূর্ণমূর্তি। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রচারে সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন এই শহরে। পুর-আর্কাইভে রয়েছে তাঁর টেলিগ্রাম। আশপাশে দেখার মতো আছে অসমবঙ্গীয় শাশ্বতমঠ, পূষণ আশ্রম, শঙ্কর মঠ, সৎসঙ্গ আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, ডাকাত কালীবাড়ি, ঘোষপাড়া সতীমায়ের মন্দির। আছে জামা মসজিদ, চশমাবাবার মাজার, মানিক পীরের দরগা। নদীর ওপারে হংসেশ্বরী মন্দির, ব্যান্ডেল চার্চ, ইমামবাড়া, ঐতিহ্যশহর চুঁচড়া— প্রতিটিই এক-একটি ইতিহাস।

পুর কর্তৃপক্ষ জানান, এ শহরের ঐতিহ্য সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে আগ্রহী করতে প্রথম পর্যায়ে আঞ্চলিক নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যাতে তাঁরা পড়ুয়াদের শহরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলিতে নিয়ে আসেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে একই আর্জি জানানো হবে কলকাতা-কল্যাণীর প্রতিষ্ঠানগুলিতে। এক-আধদিন থেকে যাঁরা হালিশহর দেখতে চান, তাঁদের জন্য গঙ্গাতীরে পুরসভা তৈরি করেছে সুন্দর দোতলা অতিথিশালা। সেখানে দু’টি দ্বিশয্যার ঘর রয়েছে। পর্যটনের প্রসারে ত্রুটি রাখতে চায় না পুরসভা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement