খাওয়া-দাওয়ার কথা উঠলেই সেকাল আর একালের তুলনা চলে আসে। বয়স্ক মানুষেরা বলেন সেকালে আমরা খাঁটি শাক-সব্জি, দুধ-মাংস-মাছ খেতাম। সব টাটকা। একালে তেমন নয়। এই কথার সত্য-মিথ্যা বিচার করা মুশকিল। কারণ সেকাল নেই। তবে বাঙালি সেকালে কী খেত, কী ভাবে খেত—তার ছবি আছে পুরনো বাংলা সাহিত্যে।
উচ্চ ফলনশীল চাল, বিদেশে রফতানির গুণমানের বাসমতী নয়—ধনী পরিবারের উৎসবে পরিবেশিত হত শালিধানের ভাত। ‘শাল্যা অন্ন বেঞ্জন পিষ্টক পরমান্ন’ রান্না হয়েছিল চাঁদের ছেলে লখীন্দরের মুখে-ভাতে। জ্ঞাতিরা খেয়ে খুশি, বিপ্ররা সন্তুষ্ট।
মুখে ভাতের খাবার আর যুদ্ধে যাওয়ার খাবার এক নয়। সেখানে আমিষের প্রাধান্য। কৃত্তিবাসী রামায়ণে লঙ্কা কাণ্ডে কুম্ভকর্ণের ঘুম তো ভাঙানো হল। তারপর? অকাল নিদ্রাভঙ্গের পর বেজায় খিদে—কলসি-কলসি মাংস ব্যঞ্জনের ব্যবস্থা। বিয়েবাড়িতে গিয়ে এক বালতি মাংস খাওয়ার কথা তো আশির দশকেও শোনা যেত। খেয়ে-দেয়ে যুদ্ধে গিয়ে কুম্ভকর্ণ যদিও মরেই গেল।
দেবতাদের মধ্যে শিব অলস। রোজগারের ঠিক নেই। কোনও দিন ভিক্ষে করে আনে, কোনও দিন আনে না। কিন্তু খাওয়ার ইচ্ছে ষোলো আনা। সামান্য আয়োজন থেকে গৌরী শাক, শুক্তো, দশ রকম ভাজা দিয়ে পাত সাজিয়ে দিলে—‘খাত্যা খাত্যা মাথা নাড়ে দেবতার রাজা।’ ‘শার্দ্দুল ঝাঁপনে’ সব খেয়ে ‘উঠিল উদ্গার’। বাঘের মতো খেয়ে ঢেকুর তুলে যখন পেট শান্ত হল, তখন প্রশংসিয়া বলে বিশ্বনাথ, —‘সত্য সতী তুমি অতি ধন্য দু’টি হাত।’ সবই ও কোমল হাতের গুণে।
সব বর এমন নয়। চণ্ডীমঙ্গলে ফুল্লরা কত কিছু রাঁধে, ব্যাধ কালকেতু শুধু চুপ করে খায়। কিছুই বলে না। ফুল্লরার খুব দুঃখ।