১৮ বছর পরে মুক্তি! যদিও জামিনে, তবু খোলা আকাশের নীচে এসে দাঁড়াবার অধিকার তো মিলল। জন্মের পর থেকে ‘জঙ্গি’ বাবাকে কখনও দেখেনি ১৮ বছর বয়সী কন্যা বুলবুলি। ছেলে জুমনের স্মৃতিতেও ঝাপসা বাবার মুখ। আজ অবশেষে পরিবারের সঙ্গে মহামিলন! চার দেওয়ালের ঘেরাটোপ থেকে এতদিনে আম-জনতার মধ্যে এসে দাঁড়ালেন আলফার সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেতিয়া। মুক্তি পেয়ে জানালেন, আর সশস্ত্র সংগ্রাম নয়, ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গণতান্ত্রিক পথেই সমস্যার সমাধান চান তিনি।
১৯৬৭ সালে তিনসুকিয়ার জেরাই গাঁওতে গোলাপ বরুয়া ওরফে অনুপের জন্ম। ১৯৭৯ সালে, শিবসাগরে পরেশ বরুয়া, অরবিন্দ রাজখোয়া, ভীমকান্ত বুড়াগোঁহাইদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি আলফার জন্ম দেন। হত্যা, অপহরণ, ডাকাতির বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত অনুপকে ১৯৯১ সালে প্রথমবার গ্রেফতার করেছিল অসম পুলিশ। কিন্তু তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়ার হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান। ১৯৯২ সালে শান্তি আলোচনার ডাকে সাড়া দেওয়ার পরেও বাংলাদেশে পালিয়ে যান অনুপ।
১৯৯৭ সালের ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় গ্রেফতার হন তিনি। ভুয়ো পাসপোর্ট নিয়ে দেশে ঢোকা, ১৬টি দেশের মুদ্রা বহন করা, বেআইনি অস্ত্র সঙ্গে রাখার তিনটি অভিযোগে আদালত তাঁকে সাতবছর কারাদণ্ডের আদেশ দেয়। ২০০৩ সালে চেতিয়া হাইকোর্টে আবেদন জানান— ভারতে তাঁর প্রাণের ভয় রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের কারাগারেই থাকতে চান। হাইকোর্ট চেতিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে নির্দেশ দেয়। কারাবাসের মেয়ার ফুরোবার পরেও সেই নির্দেশকে হাতিয়ার করে ২০০৫, ২০০৮ ও ২০১১ সালে রাজনৈতিক আশ্রয়ের মেয়াদ বাড়িয়ে নেন চেতিয়া। রাষ্ট্রপুঞ্জেও নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন পাঠান তিনি।
কিন্তু ২০১১তে পরেশ বরুয়া বাদে সভাপতি অরবিন্দ রাজখোয়া, সহ-সভাপতি প্রদীপ গগৈ, সহ-সেনাধ্যক্ষ রাজু বরুয়া-সহ আলফার কেন্দ্রীয় কমিটির সব নেতাই ভারত সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করেন। রাজখোয়ারা চেতিয়াকেও ভারতে ফেরার আহ্বান জানান। এনডিএ সরকার ও হাসিনা সরকারের দীর্ঘ আলোচনার পরে চলতি বছর ১১ নভেম্বর চেতিয়াকে সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয় ঢাকার কাশিমপুর কারাগার কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ ও সিবিআইয়ের দায়ের করা চারটি মামলায় জামিন পেয়ে আজ বিকেলে অনুপ জেল থেকে বেরোন। সকালে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন রাজখোয়া। বিকেলে তাঁকে জেল থেকে নিতে আসেন শশধর ও রাজু বরুয়া-সহ আলোচনাপন্থী আলফার একটি দল।
চোখে চশমা, গলায় লাল-কালো ডোরাকাটা মাফলার পরা অনুপ কারাগারের বাইরে এসে বলেন, ‘‘আজ উল্লাসের দিন। তবু ৩৬ বছরের সংগ্রামে এত দুঃখ, এত ত্যাগ, এত রক্তপাত হয়েছে— যে আনন্দিত হতে পারছি না। আমি আলফার পক্ষ থেকে এবং ব্যক্তিগত ভাবেও দীর্ঘ সংগ্রামে নিহত সব আলফা সদস্য ও সাধারণ মানুষের আত্মার শান্তি চাইছি। অনেক পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাকি জীবনটা অসমের ভূমিপুত্রদের উন্নয়নের জন্য প্রাণপাত করে ওই ঋণ শোধ করার চেষ্টা করব।’’
বাংলাদেশে তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় আওয়ামি লিগ ও বিএনপিকে ধন্যবাদ জানিয়ে চেতিয়া বলেন, ‘‘বাংলাদেশের সব দল-সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবি ও কারা-কর্তৃপক্ষ আমায় এতটাই ভালবাসা দিয়েছেন— কখনও মনেই হয়নি বিদেশের মাটিতে বন্দি আছি।’’
১৯৯২ সালের প্রসঙ্গ তুলে চেতিয়া বলেন, ‘‘অনেকেই হয়ত সে বারের কথা মনে রেখে আমায় বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু রাজ্য, দেশ ও বিশ্বের রাজনীতি, কূটনীতি ও সমাজে ব্যাপক বদল এসেছে। তাই আর সশস্ত্র সংগ্রামে ফিরছি না। আমি নিজে শান্তি আলোচনায় অংশ নেব। আলফার সঙ্গে ভারতের আলোচনা অনেকটা এগিয়েছে। আমাদের দাবিও কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বার গণতান্ত্রিক পথেই সমস্যার সম্মানজনক সমাধান করতে চাই।’’
পরেশের মত ও পথের থেকে সরে এলেও চেতিয়া আলফার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে সাড়ে তিন দশক ধরে সংগ্রাম চালাবার ক্ষেত্রে পরেশের নেতৃত্বদানের ক্ষমতাকে শ্রদ্ধা জানান। বলেন, ‘‘অনেক দিন পরেশের সঙ্গে আমার কথা হয়নি। ওঁর সঙ্গে কথা হলে অসমবাসীকে সব জানাব।’’
তিনটি গাড়ির কনভয়ে, অনেকটাই অনাড়ম্বরভাবে কারাগার থেকে রওনা হন চেতিয়া। বলে যান, জেরাই গাঁও যাচ্ছি। পরিবারের সকলকে কাছে পাব। অবশ্য আলফা সূত্রে খবর, আজ রাতে গোলাঘাট জেলার দেরগাঁওতে শ্বশুরবাড়িতে থাকবেন চেতিয়া।