—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
পরমাণু চুক্তি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বৈঠকের পরেই আবার যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করল ইরান। আর তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সেই উদ্যোগে আয়াতোল্লা খামেনেই-মাসুদ পেজ়েকশিয়ানের দেশের সঙ্গী হল ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া! ইরানে সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি’ (ইরনা) শুক্রবার জানিয়েছে, সমুদ্রপথের সুরক্ষা এবং দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা মজবুত করতে রাশিয়ার নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া চালানো হয়েছে ওমান উপসাগর এবং উত্তর ভারত মহাসাগরে!
এই মহড়ায় ইরানের আলভান্দ গোত্রের ডেস্ট্রয়ার, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ, হেলিকপ্টার, ল্যান্ডিং ক্র্যাফ্ট, নৌযুদ্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ’ এবং যুদ্ধ-স্পিডবোট অংশ নিয়েছিল বলে তেহরানের দাবি। মঙ্গলবার সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনেভায় পরমাণু চুক্তি নিয়ে আমেরিকা-ইরান প্রতিনিধিস্তরে বৈঠক হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার ছিলেন বৈঠকে। ইরানের তরফে ছিলেন প্রেসিডেন্ট পেজ়েকশিয়ানের সরকারের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
বৈঠকের পরে আরাঘচি বলেছিলেন, ‘আমেরিকার সঙ্গে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে ভবিষ্যতের আলোচনার দিশানির্দেশ সংক্রান্ত একটি সাধারণ সমঝোতা হয়েছে।’’ কিন্তু ওয়াশিংটনের তরফে কোনও ইতিবাচক বার্তা আসেনি। বরং আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভি ভান্স জানান, তাঁদের মূল দাবিগুলি মানতে ব্যর্থ ইরান। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের শর্তে (পরমাণু কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে) রাজি নয় তেহরান। সেই সঙ্গে ইরানকে দু’সপ্তাহের ‘সময়সীমা’ দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু সেই সময়সীমা শুরু হওয়ার আগে খামেনেইয়ের বাহিনী মস্কোকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের মহড়া শুরু করায় পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে অশান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, পরমাণু চুক্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ঘনাতেই ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ চিন সাগর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন! নিমিৎজ-শ্রেণির এই রণতরীর সঙ্গী তিনটি আর্লে বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারও পশ্চিম এশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে পেন্টাগনের ইরান উপকূলের অদূরে ঘাঁটি গেড়েছে। এর পর দক্ষিণ আমেরিকা উপকূলে মোতায়েন আর এক মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডও পশ্চিম এশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। জবাবে হরমুজ প্রণালী মার্কিন নৌবহরের অদূরেই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং যুদ্ধ মহড়া চালিয়েছে তেহরান।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভে ইরানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, ৩০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে খুন করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেইয়ের বাহিনী। এই পরিস্থিতি ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। তারই মধ্যে পরমাণু চুক্তি নিয়ে বৈঠক ফলপ্রসূ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। রাষ্ট্রপুঞ্জ নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র বারে বারেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত ১৩ জুন রাতে ইরানের রাজধানী তেহরান এবং একাধিক পরমাণুকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল ইজ়রায়েলি যুদ্ধবিমান। ওই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল, ‘অপারেশন রাইজ়িং লায়ন’! ঘটনাচক্রে, ইজ়রায়েলি হামলার দিনকয়েক আগে আইএইএ-র ডিরেক্টর জেনারেল রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি জানিয়েছিলেন, পরমাণু বোমা নির্মাণের উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালাচ্ছে ইরান। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল ইরান। ইজ়রায়েলি হামলার ন’দিন পরে ২২ জুন ইরানের তিনটি পরমাণুকেন্দ্র, ফোরডো, নাতান্জ় এবং ইসফাহানে হামলা চালিয়েছিল আমেরিকার বি-২ বোমারু বিমান। ফেলা হয় বাঙ্কার ব্লাস্টার সিরিজের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা জিবিইউ-৫৭। সেই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’। ২৪ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি হলেও ওয়াশিংটনের দাবি মেনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে এখনও পর্যন্ত রাজি হয়নি তেহরান।