ঢাকার শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন শফিকুর ইসলাম। পাশে (ডান দিকে) নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত।
ভাষা দিবসে শহিদ মিনারে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানালেন সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন এবং সে দেশের বিরোধী দলনেতা শফিকুর রহমান। এই প্রথম জামায়াতের কোনও আমির তথা শীর্ষনেতা ভাষা দিবসে শহিদ মিনারে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানালেন। কেন তিনি সেখানে গেলেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন শফিকুর। তিনি জানিয়েছেন, ‘রাষ্ট্রীয় আচার’ হিসাবে তিনি সেখানে গিয়েছেন। এটা তাঁর দায়িত্ব।
ঢাকার শহিদ মিনারে ২১ ফেব্রুয়ারি রাতের প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা জানান দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি থেকে সাধারণ মানুষ। গত বছর, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেই রীতি পালন করা হলেও আগের উৎসাহ ছিল না। ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। রাষ্ট্রপতির সেখানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে যাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছিল টানাপড়েন। শেষ পর্যন্ত তিনি গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন ইউনূসও।
তবে এ বার রাষ্ট্রপতি আগে এসে প্রধানমন্ত্রীকে সেখানে স্বাগত জানাননি। তিনি পুষ্পস্তবক দিয়ে চলে যাওয়ার পরে শনিবার গভীর রাতে সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তারেক। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুসারে, প্রথম বার ‘দোয়া, মোনাজাত’-এর মতো আচারে অংশ নিয়েছেন তারেক। তার পরে তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান হিসাবে দলীয় নেতাদের সঙ্গে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন তাঁর স্ত্রী এবং কন্যাও। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরে শহিদ মিনারের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
শহিদ মিনারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সঙ্গে স্ত্রী এবং কন্যা। ছবি: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সূত্রে।
প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরে এই প্রথম বার শহিদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান শফিকুর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জামায়াতের কয়েক জন শীর্ষ নেতা এবং জোটশরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সেই নিয়ে সমাজমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা। অনেকেই মনে করিয়ে দেন, এই রীতিকে জামায়াত নেতারা ‘ইসলাম-বিরোধী’ বলতেন। তা হলে কেন সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে গেলেন জামায়াত আমির শফিকুর। শহিদ মিনারে ফুল দেওয়ার পরে তাঁকে এই প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে, শফিকুর বলেন, ‘‘এ বার রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে…এটা আমার দায়িত্ব। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সঙ্গীদের নিয়ে আমাকে আসতে হবে। তাই আমি এসেছি।’’
সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াত পেয়েছে ৬৮টি আসন। তাদের জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। শফিকুর বিরোধীনেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তার দল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে চলেছে। শনিবার শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে তিনি বিভিন্ন আন্দোলনে শহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর কথাও বলেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা ভাষা শহিদের আগে ১৯৪৭ সালে (পাকিস্তান যখন তৈরি হয়) যাঁরা শহিদ হয়েছেন, তাঁদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। ১৯৫২ সালের শহিদদের স্মরণ করি, একাত্তরের শহিদদের স্মরণ করি। ৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে যাঁরা শহিদ হয়েছেন, তাঁদের স্মরণ করি, সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট আমলে যাঁরা শহিদ হয়েছেন, তাঁদের আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, বিশেষ করে যাঁরা জুলাই যোদ্ধা হিসেবে জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে জীবন দিয়েছেন, তাঁদের স্মরণ করি। শেষপর্যন্ত আমাদের ওসমান হাদিকে আমরা স্মরণ করি।’’
এ বছরও জামায়াতের তরফে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কোনও কর্মসূচি নেই। বিরোধী দলনেতা হিসাবে শফিকুর যে সেখানে যাবেন, তা আগেই জানিয়েছিল দল। শহিদ মিনারে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, জামায়াত এই পুস্পস্তবক অর্পণকে কি এখনও ‘অনুচিত’ মনে করে? জবাবে শফিকুর বলেন, ‘‘এ সব প্রশ্ন আজ কেন?’’
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা। তাঁদের উপরে গুলি চালানো হয়। গুলিতে নিহত হন আবুল বরকত, সালাম, রফিকুদ্দিন, জব্বার-সহ বেশ কয়েক জন। দিনটি বাংলাদেশে শহিদ দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। ১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ এই দিনকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করেছে।