Chhayanaut

ধ্বংসতোরণ পেরিয়ে আলোয় ছায়ানট

প্রথমে ভাবা হয়েছিল, ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি টাকার। তার পর ধোঁয়া সরলে দেখা গিয়েছে, অনেকটাই মেরামতযোগ্য। সংগঠক ও এখনকার শিক্ষক মোমিনুল হক দুলু সেই রাতে ভেঙে দেওয়া সমস্ত বাদ্যযন্ত্র দিয়ে প্রবেশপথ সাজিয়েছেন।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৭
Share:

সাজিয়ে রাখা ধ্বংসচিহ্ন। ছায়ানটে। ঢাকায় তোলা অগ্নি রায়ের ছবি।

গ্রিক পুরাণ বর্ণিত পাখির মতোই, টুকরো হয়ে যাওয়া সেতার, হারমোনিয়াম, তানপুরার ছাই থেকে জাগছে ছায়ানট। প্রবেশ দ্বারের ডান দিকে বকুল তলার মুখে লাগানো আগুন এখন নিভে গিয়েছে। হয়তো ঘাতকের দল কাছেপিঠেই রয়েছে গা ঢাকা দিয়ে। আবার কোনও অদৃশ্য রিমোটের সঙ্কেত পেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তছনছ করতে চাইবে বাংলা গানের সত্তা। তবুও আজ ছায়ানটের পাঁচিল টপকে, ধানমন্ডির এই সাত মসজিদ রোড ছাপিয়ে, গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ছে সুরেলা প্রতিবাদের এই ভাষা, প্রতিরোধের এই পাল্টা আগুন এখানে দ্বিগুণ জ্বলছে। গেটে দাঁড়িয়েই কানে আসছে কচিকণ্ঠের সম্মিলিত ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে’। যা এই পরিবেশে শুনতে লাগছেমন্ত্রের মতো।

দাঁড়িয়ে রয়েছি ঠিক সেই আকাশের নীচে, যেখানে আলো এখন দুর্লভ, ভূষণ এখন সন্দেহ, পরিধান যেন আতঙ্ক। কালো পোশাক পরা র‌্যাব বাহিনীর জিপ ও অস্থায়ী তাঁবু সুরকে কার্যত পাহারা দিচ্ছে! সন্ত্রাস বাইরে থেকে নিঃস্ব করেছে ঢাকাকে, ভিতর থেকে তৈরি করেছে প্রতিবাদ। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সন্‌জীদা খাতুনের পুত্র পার্থ তনভির নভেদ গত ১৮ ডিসেম্বরের রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মূল্যবান সব নথি, পুরনো কাগজপত্র, সংরক্ষিত সাংস্কৃতিক দলিল। ‘‘সরকারের শীর্ষ স্তর থেকে সন্ধ্যা নাগাদ জানিয়ে দেওয়া হয়, হামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা কয়েক জন সেই রাতেই গিয়ে এখান থেকে জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছি। বেরিয়েছি সওয়া ১টা নাগাদ, আর কয়েকশো উন্মত্ত হামলাকারী ঢুকেছে তার মিনিট কুড়ি পরেই। ফলে আর্কাইভ ওরা নষ্ট করতে পারেনি, বাঁচাতে পেরেছি,’’ জানাচ্ছেন পার্থ। শান্ত ভাবে জানালেন, ‘‘আর একটু সময় বেশি থাকলেই ওদের মুখোমুখি পড়তাম। তার পর কী হত, আজ বলা যায় না। তবে ভয় করলে তো চলবে না, প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে তো হবে। কোনও ধর্মের সঙ্গে আমাদের বিরোধ নেই।’’

রবীন্দ্রগান, নজরুলগীতি, লালন, সুফিতে ধ্বনিময় এই প্রতিষ্ঠান ’৬৭ সাল থেকে টানা বৈশাখের প্রথম দিন রমনা বটমূলে উৎসবের মূল কান্ডারি। পরদিন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও একই রকম হামলা। এর পর গর্জে ওঠে ঢাকা। সাত মসজিদ রোডে ছায়ানট ভবনের সামনের ফুটপাতে লাইন দীর্ঘ হয়ে পৌঁছে যায় ২৭ নম্বর মোড় পর্যন্ত। পরপর তিন সারি করে দাঁড়ানোর পরও জায়গা না হওয়ায় ভিড় উপচে পড়ে। খোল, তবলা, হারমোনিয়াম আর উদাত্ত কণ্ঠে ঊর্ধ্ব গগনে মাদল বাজতে থাকে। অন্তর্বর্তিকালীন সরকার সেই রাতের ভাঙচুর, লুটপাটের তদন্তের নির্দেশ দিয়ে, প্রহরায় ঘিরে রেখেছে এর পর। সামনে নির্বাচন আসছে, কখন কী ঘটে যায়!

প্রথমে ভাবা হয়েছিল, ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি টাকার। তার পর ধোঁয়া সরলে দেখা গিয়েছে, অনেকটাই মেরামতযোগ্য। সংগঠক ও এখনকার শিক্ষক মোমিনুল হক দুলু সেই রাতে ভেঙে দেওয়া সমস্ত বাদ্যযন্ত্র দিয়ে প্রবেশপথ সাজিয়েছেন। সেই ধ্বংসতোরণের ভিতরে ঢুকে সদ্য ‘শুদ্ধ সংগীত উৎসব’ও হয়ে গেল জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের শেষে, যা তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠান। তবে ছায়ানটের রেওয়াজ অনুসারে, উৎসবের শেষ দিন রাতভর গান এই প্রথম বন্ধ রাখা হল নিরাপত্তার খাতিরে।

‘‘আমি এই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র ছিলাম, তখন ছাত্রদের বেশির ভাগই ছিল মুসলিম। আর আজ বাংলা গান শিখতে আসা মুসলমান পরিবারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র হিন্দু। মনে হয়, পারিবারিকভাবে গান শেখা বা গাওয়া নিয়ে গোঁড়ামি বাড়ছে মুসলিমদের। অথচ কোরান বা হাদিস শরিফে কোথায় গানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে? আসলে বাঙালি জাতিসত্তাকে ভয় দেখানোর জন্যই এই আক্রমণ,’’ জানাচ্ছেন মোমিনুল হক দুলু। আর প্রধান ব্যবস্থাপক দুলাল ঘোষের কথায়, ‘‘রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই, ভাবিওনি এমনটা ঘটতে পারে।’’

ছায়ানটের নববর্ষ উৎসব ইউনেস্কো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তবে চব্বিশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই কট্টরপন্থী রাজনীতির অংশ ও সংগঠন বাংলা নববর্ষ উৎসব উদ্‌যাপনের বিরোধিতা করেছে প্রকাশ্যে। ওসমান হাদির মৃত্যু, ছায়ানট তাণ্ডবের একটি উপলক্ষ ছিল বলেই এখন মনে করছেন এখানকার সংশ্লিষ্ট মানুষরা। ছ’তলা ভবনের সব সিসি ক্যামেরা-সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর এবং ফোন ও ল্যাপটপ লুটই নয়, হামলাকারীরা সেই রাতে ছিঁড়ে দিয়েছিল প্রয়াত সনজীদা খাতুন, কবি নজরুল ইসলামের ছবি। একই দিনে কট্টরপন্থীদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল দুই সংবাদপত্রের অফিস।

বাংলাদেশে ঘোর অনিশ্চিত ও টালমাটাল সময়ে উজ্জ্বল ইতিহাস লিখছে ছায়ানট।

(চলবে)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন