চিনা মিডিয়ায় তির ট্রাম্পকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ে চিন ও পাকিস্তান কিছুটা বিপাকে পড়তে পারে বলে ধারণা ছিল অনেকের। আজ চিনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্রে আক্রমণ করা হয়েছে ট্রাম্পকে। নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়বেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানি কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে ভূ-রাজনৈতিক খেলার প্রথম রাউন্ডে পরিস্থিতি ভারতের পক্ষে বেশ অনুকূল।
ট্রাম্পের বিদেশনীতি দক্ষিণ এশিয়ার সমীকরণ কতটা বদলে দেবে তা নিয়ে গতকালই হিসেব শুরু হয়েছে বিভিন্ন রাষ্ট্রে। গোটা নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প একযোগে আক্রমণ করে গিয়েছেন চিন এবং পাকিস্তানকে। ট্রাম্প শিবির বার বার দাবি করেছে, দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকাকে দুইয়ে বেজিং নিজেদের ভাঁড়়ার ভর্তি করেছে বলে প্রচারের সময় চিনকে আক্রমণ করে এসেছে টিম ট্রাম্প। তাদের বক্তব্য, আমেরিকায় উৎপাদন শিল্প ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে, তখন এই ক্ষেত্রে নিজেদের সমৃদ্ধ করে গিয়েছে চিন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কে আমেরিকার পণ্য আমদানি কমিয়ে বাড়িয়ে গিয়েছে চিনা পণ্যের রফতানি। তৈরি হয়েছে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চিনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার কথাও বলেছেন ট্রাম্প। চিনে কর্মরত মার্কিন সংস্থাগুলিকে কর ছাড় দিয়ে দেশে ফেরাতে চান ট্রাম্প।
আজ নিজেদের মুখপত্রে কিছুটা সুর চড়িয়ে তাঁকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিল চিনের কমিউনিস্ট পার্টি। মুখপত্রটির দাবি, ট্রাম্প চিন ও আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে অর্থনৈতিক লড়াই করে তুলতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চিনকেও পাল্টা পদক্ষেপ করতে হবে। তবে সেইসঙ্গে তাদের দাবি, ট্রাম্প প্রচারের সময়ে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার সবটা পালন করতে পারবেন বলে মনে হয় না।
প্রাক্তন বিদেশসচিব শ্যাম সারনের কথায়, ‘‘চিন সম্পর্কে ট্রাম্প সত্যিই একই নীতি নিয়ে অগ্রসর হন কিনা, সেটা দেখার বিষয়। আজকের এই চিনা-মার্কিন উত্তপ্ত সম্পর্ক ভবিষ্যতে বাস্তবের মাটিতে এবং বিভিন্ন দায়বদ্ধতার কারণে বদলাতেও পারে। আবার ট্রাম্প জমানায় চিনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাহুগ্রস্ত হলে ভারত সেই পরিসর দখল করতে পারে কিনা সেটাও দেখতে হবে।’’
শুধু বেজিং-ই নয়, একই রকম উদ্বেগ দেখা গিয়েছে ইসলামাবাদেও। প্রচারের সময়ে পাকিস্তানকে সরাসরি সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্য বলেছিলেন ট্রাম্প। এমন কথা এত দিন পর্যন্ত (ওবামা যুগে) এমন স্পষ্ট ভাবে শুনতে অভ্যস্ত ছিল না পাকিস্তান। ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় নেওয়ার জন্য পাকিস্তান ক্ষমা চায়নি বলেও পাকিস্তানকে আক্রমণ করেছিলেন ট্রাম্প। সেইসঙ্গে মুসলিম বিদ্বেষের ইঙ্গিতও তাঁর বক্তব্যে নানা সময়ে ফুটে উঠেছে। তবে এরই মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখছে ইসলামাবাদ। সম্প্রতি কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। পাক বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র নাফিস জাকারিয়ার বক্তব্য, ‘‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কথা হয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাবকে আমরা স্বাগত জানিয়েছিলাম।’’
উরি কাণ্ডের পরে কার্যত ছায়াযুদ্ধ চলছে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। তখন আমেরিকার নয়া প্রেসিডেন্টের নীতি ইসলামাবাদকে কিছুটা হলেও প্যাঁচে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
লাহৌরের বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞ হাসান আসকারি রিজভির মতে, ‘‘আমেরিকা পাকিস্তানকে ত্যাগ করবে না। কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কাজটা ভারতের পক্ষে অনেক সহজ হবে বলেই মনে হয়।’’ আমেরিকায় প্রাক্তন পাক রাষ্ট্রদূত শেরি রহমানের কথায়, ‘‘ট্রাম্প মুসলিম বিদ্বেষী কথাবার্তা বলেছেন। সঙ্কটের সময়ে এই কথাবার্তার স্মৃতি দু’দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।’’ অন্য দিকে আমেরিকায় ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত রণেন সেনের মতে, ‘‘সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ট্রাম্প কঠোর অবস্থান নেবেন বলেই আশা করা যায়। পাকিস্তানকে গত দশ বছর ধরে অবাধে অর্থ দিয়ে এসেছে আমেরিকা। এ বার সেটাও বন্ধ হতে পারে।’’
প্রাক্তন বিদেশসচিব কানোয়াল সিব্বলের মতে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সমীকরণও দিল্লির কাছে স্বাগত। আজ তিনি বলেন, ‘‘রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নয়াদিল্লির জন্য নতুন উপহার। রাশিয়া এবং আমেরিকার সঙ্গে একই সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছুটা মূল্য দিতে হয়েছে সরকারকে। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের মৈত্রীতে চিড় ধরেছে।’’ সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিবাদের মধ্যেও পাকিস্তানে গিয়ে সামরিক মহড়া দিয়ে এসেছে রুশ সেনা। কানোয়ালের মতে, মস্কো এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে বোঝাপড়া থাকলে নয়াদিল্লির জন্য জটিলতা কমবে।
বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘এ কথা স্পষ্টই বলা ভাল যে হিলারি ক্লিন্টন জিতে এলে এমনটা আদৌ ঘটত না। ডেমোক্র্যাটরা বাণিজ্যিক ভাবে চিন এবং কৌশলগত ভাবে পাকিস্তানের হাতে তামাক খাওয়ার নীতি নিয়ে চলেছিলেন।, হিলারি এলে তা থেকে খুব একটা সরে আসতেন বলে মনে হয় না।’’
তবে ভূ-কৌশলগত ভাবে স্বস্তিতে থাকলেও আমেরিকায় ভারতীয় পেশাদারদের চাকরির ভবিষ্যৎ, তাঁদের ভিসা এবং বাণিজ্য নীতির মতো বিষয়গুলি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ভারতের। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলে বাণিজ্য-প্রশ্নে আমেরিকায় পাঁচিল তোলার কতা ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। ভারত দেখতে চাইছে, এই প্রতিশ্রুতিকে কতটা বাস্তবায়িত করতে চান তিনি। বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তার কথায়, ‘‘এ কথা ভুললে চলবে না যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত আমেরিকার সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ফলে আমেরিকা যদি ভারতীয়দের জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন করে দেয় অথবা আউটসোর্সিং কমিয়ে দেয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও।’’ দিল্লির আশা, ভারতের বিরাট বাজারকে অগ্রাহ্য করা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষেও সম্ভব হবে না।