(বাঁ দিকে) বাংলাদেশের জামাত প্রধান শফিকুর রহমান। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
বাংলাদেশের কট্টর ইসলামপন্থী দল জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করতে চাইছে আমেরিকা। তবে একই সঙ্গে প্রস্তুত রাখা হয়েছে কট্টরপন্থার ‘দাওয়াই’ও। একটি রিপোর্টে এমনটাই দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। বাংলাদেশে উপস্থিত মার্কিন কূটনীতিবিদদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের কথোপকথনের একটি অডিয়ো রেকর্ডিং তাদের হাতে এসেছে। তার ভিত্তিতেই রিপোর্টটি প্রস্তুত করা হয়েছে। জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রসঙ্গে আমেরিকা আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও অবস্থান গ্রহণ করেনি।
জামাত বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল। দেশটির ৫৫ বছরের ইতিহাসে একাধিক বার জামাতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলেও এই দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। তবে ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে আবার সক্রিয় হয়েছে জামাত। ইসলামি শরিয়া আইন মেনে সরকার পরিচালনার পক্ষপাতী তারা। এমনকি, সন্তান পরিচালনার কর্তৃব্য পালনের জন্য মহিলাদের কাজের সময় কমিয়ে দেওয়ার পক্ষেও জামাত সওয়াল করেছে বার বার। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য সামাজিক সমস্যা এই দলে প্রাধান্য পাচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, দুর্নীতি দূর করাই তাদের লক্ষ্য।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও জামাত ভোটে লড়বে। দলের নেতাকর্মীরা এ বারের নির্বাচনে সবচেয়ে ভাল ফল করার আশা রেখেছেন। প্রচারও চলছে জোরকদমে। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই হাওয়া বুঝে জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকেছে আমেরিকা। মার্কিন কূটনীতিকেরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই দলের নেতাদের সঙ্গে কাজ করতে তাঁরা প্রস্তুত। ঢাকায় বাংলাদেশের মহিলা সাংবাদিকদের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকদের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছিল গত ১ ডিসেম্বর। এক কূটনীতিককে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘আমরা জামাতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেই চাই। আপনারা কি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন? ওঁরা কি আপনাদের অনুষ্ঠানে আসতে রাজি হবেন?’’
বাংলাদেশে ক্ষমতায় এলেও জামাত তাদের কট্টর ইসলামপন্থাকে দেশের উপর চাপিয়ে দিতে পারবে না, মনে করেন মার্কিন কূটনীতিক। এখানেই আমেরিকার ‘দাওয়াই’-এর প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। অডিয়োতে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘জামাত শরিয়া চাপিয়ে দেবে, আমি এটা বিশ্বাসই করি না। আর যদি দলের নেতারা তা করার চেষ্টা করেন, আমেরিকা পরের দিনই তাদের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেবে।’’ নিরাপত্তার স্বার্থে এই মার্কিন কূটনীতিকের নাম রিপোর্টে গোপন রাখা হয়েছে।
ঢাকায় আমেরিকার দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শি জামাতের সঙ্গে মার্কিন ঘনিষ্ঠতার কথা মানতে চাননি। তিনি বলেছেন, ‘‘ডিসেম্বরের ওই কথোপকথন স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কূটনীতিকদের সাধারণ আলাপচারিতা মাত্র। সেখানে অনেক রাজনৈতিক দলকে নিয়েই আলোচনা হয়েছে। আমেরিকা কোনও একটি দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির পক্ষপাতী নয়। বাংলাদেশের মানুষ যে দলকে সরকারে নির্বাচিত করবে, আমেরিকা তাদের সঙ্গেই কাজ করবে।’’ জামাতের মার্কিন মুখপাত্র মহম্মদ রহমান বলেছেন, ‘‘ব্যক্তিগত পরিসরে একটি কূটনৈতিক বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে আমরা কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’’
ক্ষমতায় আসা বা না-আসা নিশ্চিত না-হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামী দিনে জামাত যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করতে চলেছে, মার্কিন কূটনীতিবিদেরা তা আন্দাজ করেছেন। সেই কারণেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে আমেরিকা যদি বাংলাদেশের জামাতের ঘনিষ্ঠ হয়, তবে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। আটলান্টিক পর্ষদে দক্ষিণ এশিয়ার সিনিয়র প্রতিনিধি মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘‘বহু বছর ধরে বাংলাদেশে ভারতের চিন্তার সবচেয়ে বড় কারণ জামাত। ভারত এই দলকে পাকিস্তানের বন্ধু হিসাবে দেখে। ফলে এই দল বাংলাদেশে ক্ষমতায় এলে তা ভারতের জন্য নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’’ তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের কোনও প্রভাব ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের উপর পড়বে না বলে দাবি করেছেন মার্কিন মুখপাত্র।